**জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম রূপগঞ্জ** দেশের দ্বীনি শিক্ষাঙ্গনে একটি সুপরিচিত এবং অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান। এটি একটি ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যা সুদীর্ঘ সময় ধরে জাতিকে সহীহ দ্বীনের পথে দিশা দিচ্ছে এবং ইসলামী মূল্যবোধ রক্ষায় বলিষ্ঠ নেতৃত্ব প্রদানে বদ্ধপরিকর। **দারুল উলূম দেওবন্দের সিলসিলাভুক্ত** আদর্শিক কেন্দ্র হিসেবে, জামিয়া সর্বদা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়। প্রতিষ্ঠানটি তার শিক্ষাদান পদ্ধতি, কঠোর মানহাজ এবং নৈতিক প্রশিক্ষণের জন্য সর্বমহলে প্রশংসিত।
দারুল উলূম দেওবন্দের আদর্শ ও মানহাজ
এই জামিয়া বিশ্ববিখ্যাত মাদারে ইলমি **দারুল উলূম দেওবন্দের** মূল নীতি ও আদর্শ (মানহাজ) কঠোরভাবে অনুসরণ করে আসছে। এই মানহাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো: কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক শিক্ষাদান, শরীয়তের সকল বিষয়ে সুন্নাতে রাসূলের পূর্ণ অনুসরণ, এবং মুসলিম উম্মাহর চারিত্রিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির দিকে জোর দেওয়া। এই আদর্শ জামিয়ার প্রতিটি শিক্ষকের তালীম এবং ছাত্রদের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিফলিত হয়।
বিশেষত, ইলমে হাদীস, তাফসীর ও ফিকাহ শাস্ত্রের মৌলিক গ্রন্থগুলোর ওপর গভীর জ্ঞান অর্জনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। দেওবন্দের এই মানহাজ নিশ্চিত করে যে জামিয়া থেকে বের হওয়া আলেমগণ যেন কেবল জ্ঞানীই না হন, বরং সমাজে দ্বীনের প্রকৃত প্রতিচ্ছবি হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতে পারেন। ফলস্বরূপ, জামিয়া থেকে প্রতি বছর এমন আলেমগণ বের হচ্ছেন, যারা একদিকে যেমন গভীর ইসলামী জ্ঞানে সমৃদ্ধ, তেমনি অন্যদিকে সমাজের জটিল সমস্যা সমাধানে সক্ষম ও দেশপ্রেমিক।
শিক্ষাক্রমের বিস্তারিত রূপরেখা ও বিভাগসমূহ
জামিয়ার শিক্ষাক্রমে প্রাথমিক স্তর **মক্তব বিভাগ** থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ স্তর **দাওরায়ে হাদীস (মাস্টার্স সমমান)** পর্যন্ত সকল স্তর অন্তর্ভুক্ত। পাঠ্যক্রম এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে পর্যায়ক্রমে শিক্ষার্থীরা ইলমে দ্বীনের গভীরে প্রবেশ করতে পারে।
জামিয়ার মূল বিভাগসমূহ:
- মক্তব ও নাযেরা বিভাগ: শিশুদের তাজবীদসহ কুরআন শিক্ষা, প্রাথমিক ধর্মীয় জ্ঞান এবং সহীহভাবে কুরআন তেলাওয়াত শেখানো হয়।
- হিফজুল কুরআন বিভাগ: মানসম্মত ক্বারী সাহেবদের মাধ্যমে ছাত্রদের মানসম্পন্ন হাফেজ হিসেবে গড়ে তোলা হয়।
- কিতাব বিভাগ: ইবতিদাইয়াহ (প্রাথমিক) থেকে শুরু করে দাওরায়ে হাদীস পর্যন্ত কুরআন, হাদীস, ফিকহ, তাফসীর, আকাইদসহ সকল প্রয়োজনীয় বিষয়ের শিক্ষা প্রদান করা হয়।
উচ্চতর বিশেষায়িত বিভাগসমূহ (তাখাসসুস):
দাওরায়ে হাদীস সমাপ্তির পর যারা ইসলামী জ্ঞানের নির্দিষ্ট শাখায় গভীর গবেষণা করতে ইচ্ছুক, তাদের জন্য রয়েছে তাখাসসুস বা বিশেষায়িত বিভাগ।
- তাখাসসুস ফিল ফিকহ: ফিকহে হানাফীর গভীর অনুশীলন এবং যুগোপযোগী নতুন মাসআলা-মাসায়েল নিয়ে গবেষণার ব্যবস্থা।
- তাখাসসুস ফিল হাদীস: সহীহ হাদীসের তাখরীজ ও তাহকীক (যাচাই-বাছাই) এর ওপর বিশেষ দক্ষতা অর্জনের ব্যবস্থা রয়েছে।
- তাখাসসুস ফিদ দাওয়াহ: সমাজের বিভিন্ন স্তরে ইসলামী দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ পরিচালনার জন্য যোগ্য দাঈ তৈরি করা।
এছাড়াও, জামিয়ার পাঠ্যক্রমে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, ইতিহাস, ভূগোল, দর্শন ইত্যাদি আধুনিক বিষয়সমূহের প্রাথমিক শিক্ষাও দেওয়া হয়, যাতে ছাত্ররা কেবল দ্বীনি জগতেই নয়, বরং জাগতিক জ্ঞান লাভ করে আধুনিক সমাজের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে।
জামিয়ার প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: বিস্তারিত অঙ্গীকার
- ইলমে দ্বীনের হেফাজত ও প্রচার: ইলমে দ্বীনের হেফাজত ও ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে হক্কানি, খোদাভীরু আলেম তৈরি করা।
- আকাঈদের সংরক্ষণ: আকাঈদে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত ও ফিকহে হানাফীর মূলনীতিগুলোর সঠিক সংরক্ষণ করা।
- আদর্শ নেতৃত্ব তৈরি: সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নৈতিকতা ও সততার ভিত্তিতে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য যোগ্য আলেম ও দক্ষ সমাজ সংস্কারক তৈরি করা।
- ইসলামবিদ্বেষী ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা: পশ্চিমা সংস্কৃতি ও ইসলামবিদ্বেষী বিভিন্ন অপপ্রচারের বিপরীতে যুক্তি ও জ্ঞানের মাধ্যমে ইসলামের সঠিক চিত্র তুলে ধরে জাতিকে রক্ষা করা।
- শিক্ষার্থীর নৈতিক প্রশিক্ষণ: নিয়মিত তালীম ও তারবিয়াতের মাধ্যমে ছাত্র-শিক্ষকদের দেশ ও জাতির খেদমত করার জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তোলা।
পরিশেষে বলা যায়, **জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম রূপগঞ্জ** একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে শুধু ধর্মীয় জ্ঞানই বিতরণ করে না, বরং শিক্ষার্থীদের নৈতিক, আধ্যাত্মিক এবং সামাজিক দায়িত্ব পালনেও প্রস্তুত করে তোলে। প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে মুসলিম উম্মাহর খেদমত করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের এই পথচলায় সকলের আন্তরিক সহযোগিতা ও দোয়া একান্ত কাম্য।