বর্ষ: ১, সংখ্যা: ২
জুমাদাল আখিরাহ ১৪৪৭ | সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর- ২০২৫
"শান্তি ও নিরাপত্তা সংকট এবং সিরাতে তাইয়্যিবার আলোকে সমাধান" —ড. বশির আহমদ রিন্দ
আজকের আধুনিক ও উন্নত যুগ—যা রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও জ্ঞানের ক্ষেত্রে উচ্চ শিখরে পৌঁছে গেছে— এই যুগেও পৃথিবী শান্তি ও নিরাপত্তার সমস্যায় ঠিক তেমনি ভুগছে, যেমন ভুগেছিল সাড়ে চৌদ্দশ বছর পূর্বের সমাজ। আজও মানুষের রক্ত সস্তা, মর্যাদা পদদলিত, সম্পদ অনিরাপদ, ধর্মীয় ও চিন্তার স্বাধীনতা অরক্ষিত। আজও বর্ণ, জাতি, গোত্র, জাতীয়তার অহম মুছে যায়নি; উচু-নীচের বিভেদ শেষ হয়নি। ন্যাশনালিজম, ফ্যাসিজম, সমাজতন্ত্রের মতো নানা মতবাদ এসেছে; কিন্তু কেউ মানুষের এসব মৌলিক সমস্যার সমাধান দিতে পারেনি। লিগ অব নেশনস ও জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়েছে, তবুও শান্তি ও নিরাপত্তার সংকট আগের মত রয়ে গেছে। আজও চলছে “জোর যার মুল্লুক তার” নীতি।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—দুনিয়ায় শান্তিশৃঙ্খলা কেন হারিয়ে যাচ্ছে এবং কেন অশান্তির ভূত ছড়িয়ে পড়ছে? আর রাসুল ﷺ এর সিরাত এই সমস্যার সমাধান কীভাবে দিয়েছে?
এই প্রবন্ধে মূলত সেই সমস্যার প্রকৃত কারণ ও তার সমাধান সিরাতের আলোকে খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।
বস্তুত, রাসুল ﷺ যে দ্বীন এনেছেন, তার নাম ইসলাম—যার অর্থ শান্তি ও নিরাপত্তা। অর্থাৎ রাসুল ﷺ -এর আনিত ধর্ম হলো শান্তি ও নিরাপত্তার ধর্ম। যার প্রতিটি আদেশ ও নিষেধাজ্ঞার পেছনে শান্তি ও নিরাপত্তার রহস্য লুকানো রয়েছে।
তেমনি, যখন আমরা রাসুল ﷺ -এর সিরাতে তাইয়্যেবার প্রতি লক্ষ্য করি, তখন তাঁর শিক্ষা ও পবিত্র জীবনচরিত থেকে শান্তি ও নিরাপত্তা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। রাসুল ﷺ বলেছেন—
الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ
অর্থ: প্রকৃত মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে সকল মুসলিম নিরাপদ থাকে। (বুখারী: ১০)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ النَّاسُ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ وَالْمُؤْمِنُ مَنْ أَمِنَهُ النَّاسُ عَلَى دِمَائِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ
অর্থ: আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুল ﷺ বলেছেনঃ মুসলিম ঐ ব্যক্তি, যার হাত ও জিহ্বা হতে অন্য মানুষ নিরাপদ থাকে। আর মু’মিন ঐ ব্যক্তি, যার থেকে অন্য লোক নিজের জান ও মালকে নিরাপদ মনে করে। (নাসায়ী: ৪৯৯৫)
এর সুস্পষ্ট অর্থ হলো—রাসুল ﷺ -এর আনিত বার্তা 'ইসলাম' ও পবিত্র জীবনের মূল উদ্দেশ্য হলো, মানুষের সমাজকে সকল প্রকার বৈষম্য ছাড়া শান্তি ও নিরাপত্তা প্রদান করা।
অশান্তির কারণ
সমাজ থেকে কোনো নিন্দনীয় জিনিস দূর করতে হলে জরুরি হলো, তার কারণ ও উপসর্গগুলো দূর করা। এই দিক থেকে অশান্তির কারণ নিয়ে ভাবা হলে দেখা যায় সমাজে অশান্তি, বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনার মূল হেতু কিছু বড় ধরনের অন্যায়।
তন্মধ্যে প্রধানগুলো হলো—
কারো জীবন, সম্পদ বা মর্যাদায় অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ করা। কারো ধর্মে জোরপূর্বক হস্তক্ষেপ করা। লোভে পড়ে অন্যের ভূখণ্ড দখলের উদ্দেশ্যে আক্রমণ করা। বর্তমান পরিভাষায় যেগুলোকে 'Violation of Human Rights' (মানবাধিকার লঙ্ঘন) বলা হয়।
এখন দেখা যাক, এ বিষয়ে নবি করিম ﷺ এর সিরাত আমাদের কী শিক্ষা দেয়।
১. মানুষের জীবনের মর্যাদা
রাসুল ﷺ এর শিক্ষা অনুযায়ী—ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের জীবন মর্যাদাপূর্ণ ও সুরক্ষিত। কোনো এক ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা পুরো মানবজাতিকে হত্যা করার সমান, আর কারো জীবন রক্ষা করা পুরো মানবজাতিকে রক্ষা করার সমান। যেমন: আল-কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
" مَن قَتَلَ نَفْسًۭا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍۢ فِى ٱلْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ ٱلنَّاسَ جَمِيعًۭا ۖ وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَآ أَحْيَا ٱلنَّاسَ جَمِيعًۭا"
অর্থ: যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করল—কোনো প্রাণের বদলা ছাড়া অথবা জমিনে ফিতনা-ফাসাদ করার অপরাধ ছাড়া—সে যেন সমস্ত মানুষকে হত্যা করল। আর যে কেউ একজনের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমস্ত মানুষের জীবন রক্ষা করল। (সূরা আল-মায়েদা, আয়াত ৩২)
অন্য আয়াতে কোন মুমিনকে হত্যা করার পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন—
"وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًۭا مُّتَعَمِّدًۭا فَجَزَٰٓؤُهُۥ جَهَنَّمُ خَٰلِدًۭا فِيهَا ۖ وَغَضِبَ ٱللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُۥ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابً عَظِيمًۭا"
অর্থ: যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করে, তার প্রতিদান জাহান্নাম; সেখানে সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হবেন, তাকে অভিশাপ দেবেন এবং তার জন্য কঠিন শাস্তি প্রস্তুত করে রাখবেন। (সূরা আন-নিসা, আয়াত ৯৩)
এক হাদিসে রাসুল ﷺ বলেছেন—
"مَنْ قَتَلَ مُعَاهِدًا فِي غَيْرِ كُنْهِهِ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ"
অর্থ: যে ব্যক্তি কোন কারণ ব্যতীত চুক্তিবদ্ধ কোন ব্যক্তিকে হত্যা করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন। (নাসায়ী: ৪৭৪৭)
রাসুল ﷺ শুধু নৈতিক দিক থেকে জীবনের মর্যাদা শেখাননি; বরং এ জন্য কিসাস ও দিয়াতের আইনও দিয়েছেন—যাতে মানুষের জীবন সুরক্ষিত থাকে। এতে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর পবিত্র সিরাত অনুযায়ী প্রতিটি মানুষের জীবন সম্মানিত—সে মুসলিম হোক বা অমুসলিম, ছোট হোক বা বড়, ধনী হোক বা গরিব। যতক্ষণ না কেউ অন্যের প্রাণে হাত দেয় বা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করে, ততক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্র বা কোনো ব্যক্তি কেউ তার জীবনে হস্তক্ষেপের অধিকার রাখে না। কিন্তু যদি অন্যায়ভাবে কারও প্রাণ নেওয়া হয়, তবে জমিনে ফিতনা ও অশান্তির দরজা খুলে যাবে।
২. মানুষের সম্পদের মর্যাদা
অশান্তি, ফিতনা ও বিশৃঙ্খলার দ্বিতীয় বড় কারণ হলো—কারো সম্পদে অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ করা; সেটা হোক কোনো ব্যক্তির সম্পদ অথবা কোনো জাতির সম্পদ।
এ বিষয়ে রাসুল ﷺ এর শিক্ষা হলো—ন্যায়সঙ্গত ও বৈধ পথ ছাড়া কারো সম্পদ ভোগ করা যাবে না। রাসুল ﷺ -এর আনিত ঐশী কিতাব, কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ.
অর্থ: হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না; তবে যদি তা পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে হয়, তবে তা বৈধ। (সূরা নিসা: ২৯)
হাদিস শরীফে এসেছে—
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: أَلا تَظْلِمُوا أَلَا لَا يَحِلُّ مَالُ امْرِئٍ إِلَّا بِطِيبِ نَفْسٍ مِنْهُ.
অর্থ: রাসুল ﷺ বলেছেনঃ সাবধান! কেউ কারো ওপর জুলুম করবে না। সাবধান! কারো মাল তার সন্তোষ ব্যতীত কারো জন্য হালাল নয়। (মিশকাতুল মাসাবিহ: ২৯৪৬)
عَن أَبي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ: كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَأم دَمُهُ وَمَالُهُ وَعِرْضُهُ.
অর্থ: আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল ﷺ বলেছেনঃ মুসলমানের উপর (প্রত্যেক) মুসলমানের জান-মাল ও ইযযত-আবরু হারাম। (মুসলিম: ২৫৬৪)
عَنْ أَبِي بَكْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ......قَالَ: فَإِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ عَلَيْكُمْ حَرَامٌ، كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا، فِي شَهْرِكُمْ هَذَا، فِي بَلَدِكُمْ هَذَا.
অর্থ: আবু বাকরা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, নবি (ﷺ) বলেনঃ "তোমাদের প্রাণ, সম্পদ ও মর্যাদা—তোমাদের জন্য ঠিক ততটা সম্মানিত, যতটা সম্মানিত আজকের দিন (৯ জিলহজ), এই মাস (যিলহজ) এবং এই শহর (মক্কা)।" (বুখারী:১৭৪১)
রাসুল ﷺ -এর পবিত্র সিরাত ও শিক্ষা অনুযায়ী—ঘুষ, ধোঁকা, মজুতদারি, ওজন-দর কমানো-বাড়ানো, হারাম ব্যবসা, অবৈধ দখল, লুটপাট, জুয়া, সুদ, চুরি—সবই জীবিকা অর্জনের হারাম মাধ্যম। এসব পথে উপার্জন হলে সমাজে ফিতনা-ফাসাদ ছড়িয়ে পড়বে, দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট হবে। তাই শান্তির দূত ﷺ এসব থেকে জীবিকা অর্জনকে হারাম ঘোষণা করেছেন, এমনকি বলেছেন—"যার মাংস হারাম সম্পদ থেকে জন্মায়, তার জন্য জাহান্নামই শ্রেয়।"
৩. মানুষের মর্যাদা রক্ষা
অশান্তির আরেক কারণ—কারো সম্মানে অন্যায়ভাবে আঘাত করা। নবি করিম ﷺ শিক্ষা দিয়েছেন—প্রত্যেক মানুষ সম্মানিত; সে শাসক হোক বা প্রজা, পুরুষ হোক বা নারী, মুসলিম হোক বা অমুসলিম, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, ধনী-গরিব—সবাই যথাযথ সম্মানের হকদার। আল্লাহ তাআলা প্রতিটি মানুষকে সম্মানের অধিকারী বানিয়ে সৃষ্টি করেছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَىٰ كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا.
অর্থ: আর অবশ্যই আমি আদম সন্তানদের মর্যাদা দান করেছি, তাদেরকে স্থল ও জলপথে বহন করেছি, তাদেরকে পবিত্র ও উৎকৃষ্ট রিযিক দিয়েছি এবং আমি আমার সৃষ্ট অনেকের উপর তাদেরকে বিশেষ মর্যাদায় শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি। (সূরা আল-ইসরা: ৭০)
এই আয়াত প্রমাণ করে—প্রত্যেক মানুষ সম্মানিত, তার ধর্ম, ভাষা, বর্ণ, দেশ যাই হোক না কেন। এ কারণেই, রাসুল তার পবিত্র শিক্ষার মাধ্যমে এমন সব কাজকে হারাম করেছেন, যার দ্বারা কোন মানুষের সম্মানে আঘাত আসে।
সূরা হুজুরাতে (১১-১২) উপহাস, কটূক্তি, অপছন্দনীয় উপাধিতে ডাকা, কু-ধারণা, দোষ খোঁজা ও গীবতকে কঠোরভাবে হারাম (নিষিদ্ধ) করা হয়েছে। একই সূরার ১৩ নম্বর আয়াতে জাতি, বর্ণ ও গোত্রভেদে শ্রেষ্ঠত্ব দাবি নিষিদ্ধ করে সবাইকে আদম-হাওয়া (আ.)-এর সন্তান হিসেবে ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
বিদায় হজের ভাষণে নবি ﷺ ঘোষণা করেন—
لَا فَضْلَ لِعَرَبِيٍّ عَلَى أَعْجَمِيٍّ، وَلَا لِأَعْجَمِيٍّ عَلَى عَرَبِيٍّ، وَلَا لِأَحْمَرَ عَلَى أَسْوَدَ، وَلَا لِأَسْوَدَ عَلَى أَحْمَرَ، إِلَّا بِالتَّقْوَى.
অর্থ: কোনো আরবের ওপর অনারবের, অনারবের ওপর আরবের, কোনো শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের, কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের শ্রেষ্ঠত্ব নেই—শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তাকওয়ার মাধ্যমে। (মুসনাদে আহমাদ:২৩৪৮৯)
রাসুল ﷺ -এর শিক্ষা বর্ণভেদ, জাতপাত, বর্ণবাদ—সবকিছুর অবসান ঘটিয়েছে। যেমন, মক্কা বিজয়ের দিনে শত শত আরব যুবককে বাদ দিয়ে কালো আফ্রিকান সাহাবি বিলাল (রা.)-কে কাবার চূড়ায় দাঁড় করিয়ে আযান দেওয়ানো—যাতে প্রমাণ হয় যে, রাসুল ﷺ -এর চোখে রঙ বা বংশের নয়; বরং ঈমান, চরিত্র ও নৈতিকতার গুরুত্ব আসল।
এমনকি, এক সাহাবি (রা.) একজন ইহুদিকে থাপ্পড় মারেন শুধু এই কারণে যে, তিনি বলেছিলেন—মূসা (আ.) মুহাম্মদ ﷺ থেকে শ্রেষ্ঠ। নবি ﷺ সর্বোত্তম নবি হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন—"আমাকে কোনো নবির ওপরে শ্রেষ্ঠ বলো না।"
মানব সমাজের দুর্ভাগ্য এই যে, আজকের এই আধুনিক ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত যুগেও প্রাচীন জাহিলিয়াতের রীতি-নীতি চালু রয়েছে। আজকের এই উন্নত ও সচেতন মানুষের জন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র জীবনাদর্শ ও শিক্ষা ঠিক ততটাই হিদায়াত ও দিশা প্রদান করে, যতটা তা চৌদ্দশ বছর আগে মানুষের জন্য করেছিল।
৪: ধর্মের প্রতি সম্মান বা ধর্মীয় স্বাধীনতা
চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ কারণ, যার ফলে বিশ্বে শান্তি-শৃঙ্খলার সমস্যা দেখা দেয়, তা হলো—কাউকে তার ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা। মানব-ইতিহাসে রাসুল ﷺ-ই প্রথম ব্যক্তি, যিনি সংকীর্ণমনা ও পক্ষপাতদুষ্ট এক সময়ে ধর্মীয় ও চিন্তাগত স্বাধীনতার পতাকা উঁচু করে ধরেছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি জবরদস্তি ও জুলুমকে ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা হিসেবে ঘোষণা করেন এবং তার শিক্ষায় ধর্মীয় ও চিন্তাগত জবরদস্তি থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকতে নির্দেশ দেন।
ফলে, তার উপর নাযিলকৃত আসমানি কিতাব—কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন:
لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ قَدْ تَبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ.
অর্থ: “ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই; হিদায়াত গোমরাহি থেকে স্পষ্টভাবে পৃথক হয়ে গেছে।" (সূরা আল-বাকারা: ২৫৬)
অন্য আয়াতে বলেছেন:
لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ
অর্থ: “তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম, আর আমার জন্য আমার ধর্ম।” (সূরা আল-কাফিরুন: ৬)
আবার আরেক আয়াতে ঘোষণা করেন:
فَمَنْ شَاءَ فَلْيُؤْمِنْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيَكْفُرْ
অর্থ: “যে ইচ্ছা করে ঈমান আনুক, আর যে ইচ্ছা করে কুফরি করুক।” (সূরা আল-কাহফ: ২৯)
রাসুল ﷺ শুধু ধর্মে জবরদস্তি নিষিদ্ধ করেননি; বরং এমন সব আচরণ থেকেও বিরত থাকতে বলেছেন—যার কারণে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে উত্তেজনা ও বিরোধ সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে।
বিষয়টি এর দ্বারা অনুমান করা যেতে পারে যে, ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো ধর্মীয় নেতা বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে গালাগালি করা হারাম ও না জায়েজ। কারণ, এতে ভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে ঝগড়া, বিবাদ, ফিতনা ও অশান্তির আশঙ্কা থাকে। যেমন কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে—
وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ.
অর্থ: তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদের তারা আহ্বান করে, তাদেরকে গালি দিও না; নতুবা তারা শত্রুতাপূর্ণভাবে ও অজ্ঞতার কারণে আল্লাহকেও গালি দেবে। (সূরা আল আনআম: ১০৮)
৫: রাষ্ট্র দখলের লালসা
দুনিয়ায় ফিতনা ও অশান্তির একটি বড় কারণ হলো “রাষ্ট্র দখলের লালসা”—যেখানে কোনো শাসক বা জাতি অন্য জাতির ভূখণ্ড দখল করার চেষ্টা করে। গত শতাব্দীতে এই লালসার কারণে পৃথিবী দুটি বিশ্বযুদ্ধ দেখেছে, যেখানে কোটি কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ইসলামি শিক্ষা ও রাসুল ﷺ-এর পবিত্র সিরাত অনুযায়ী, কারও জমি বা রাষ্ট্র দখল তো দূরের কথা, এক বিঘত জমি অন্যায়ভাবে দখল করাও জায়েজ নয়। রাসুল ﷺ বলেছেন—
من أخذ شبرا من الأرض ظلما طوقه يوم القيامه من سبع أرضين لا يقبل منه صرف ولا عدل.
অর্থ: “যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে এক বিঘত জমি দখল করবে, কিয়ামতের দিন সাত তবক জমি তার গলায় চাপিয়ে দেওয়া হবে। এবং তার নফল বা ফরজ কোনো ইবাদত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।” (বুখারি: ২৪৫২, মুসলিম: ১৬১০)
ইসলাম রাষ্ট্র দখলের উদ্দেশ্যে কোনো ভূমি দখলকে সম্পূর্ণভাবে হারাম ঘোষণা করেছে এবং মুসলমানদের এমন চিন্তা থেকেও বিরত রেখেছে। ইসলাম জিহাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে দিয়েছে—এটি কেবল “এ'লায়ে কালিমাতুল্লাহ (আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করা)’র জন্য হতে হবে, কোনো রাষ্ট্র দখল, সম্পদ লুণ্ঠন বা অন্য কোনো স্বার্থসিদ্ধির জন্য নয়। অন্যথায় সেটি জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ নয়, বরং “ফাসাদ ফিল আরদ” -(পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টির কাজ)।
হযরত আবু মূসা আশআ’রি (রা.) বর্ণনা করেন—একবার রাসুল ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করা হলো: “কেউ যুদ্ধ করে গনীমতের মাল পাওয়ার জন্য, কেউ খ্যাতি অর্জনের জন্য, কেউ বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য, আবার কেউ জাতীয়তাবাদ বা গোত্রীয় অহংকারে যুদ্ধ করে—এর মধ্যে কার যুদ্ধ আল্লাহর পথে?” তিনি ﷺ বললেন—
"من قاتل لتكون كلمة الله هي العليا فهو في سبيل الله"
অর্থ: যে ব্যক্তি যুদ্ধ করে এ উদ্দেশ্যে যে, আল্লাহর বাণী সর্বোচ্চ স্থানে পৌঁছায়—সে-ই আল্লাহর পথে যুদ্ধ করছে। (বুখারি: ২৮১০, মুসলিম: ১৯০৪)
আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করার অর্থ হলো—মানবজাতির কাছে আল্লাহর করুণাময় দ্বীন পৌঁছে দেওয়া, দুনিয়া থেকে জুলুম দূর করা, ন্যায়বিচার ও সামাজিক সমতার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, মানুষের জন্য ধর্মীয় ও চিন্তাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, এবং সাধারণ মানুষকে নির্মম, স্বৈরাচারী ও শোষণকামী শক্তির কবল থেকে মুক্ত করা। আর এই সবকিছু হতে হবে, একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।
রাসুল ﷺ আরও বলেছেন—
إن الله لا يقبل من العمل إلا ما كان له خالصا وابتغى به وجه الله.
অর্থ “আল্লাহ কেবল সেই আমল কবুল করেন, যা একান্ত তাঁর জন্য এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে করা হয়। (নাসায়ী: ৩১৪০)
দুনিয়ায় শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা এবং ফিতনা ও অশান্তি থেকে বাঁচার জন্য রাসুল ﷺ যে শিক্ষা ও পবিত্র জীবনদর্শন রেখে গেছেন, মানব ইতিহাস তেমন উদাহরণ দেখাতে অক্ষম। আজ আমাদের সমাজে যে অশান্তি, অস্থিরতা ও ফিতনা চলছে—এটি মূলত তাঁর সিরাত থেকে দূরে সরে যাওয়ার ফল।
তিনি ﷺ এ ক্ষেত্রে একটি মূলনীতি শিখিয়েছেন—
"أحب للناس ما تحب لنفسك تكن مسلما"
অর্থাৎ মানুষের জন্য সেইটিই পছন্দ করো, যা তুমি নিজের জন্য পছন্দ করো—তাহলেই তুমি পরিপূর্ণ মুসলিম হবে। (ইবনে মাযাহ: ৪২১৭)
প্রত্যেক মানুষই চায় তার জীবন, সম্পদ ও সম্মান রক্ষা হোক; সে ধর্মীয় ও চিন্তাগত স্বাধীনতা পাক; এবং তার দেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম থাকুক। সুতরাং প্রয়োজন হলো—সে যেন অন্যদের ক্ষেত্রেও একই মনোভাব রাখে এবং তাদের সাথে তেমন আচরণ করে, যেমন আচরণ সে নিজের জন্য প্রত্যাশা করে।
এখন জরুরি হলো—দুনিয়ার মানুষ, শাসক থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণ এবং সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সবাই যেন শেষ নবি ﷺ-এর পবিত্র সিরাতকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে এবং তার অনুসরণ করে। কেবল এই পথেই দুনিয়া থেকে ফিতনা ও অশান্তি দূর করা এবং শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব।
ভাষান্তর : মাওলানা রবিউল ইসলাম
রাসুল (সা.) এর জন্মতারিখ এর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ লেখক: মুফতি রেজাউল হক দা.বা. শায়খুল হাদিস ও মুফতি, জামিয়া দারুল উলুম যাকারিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা
নবিজি (সা.) এর মাদানি রাজনীতি: কিছু দৃষ্টিভঙ্গি ড. মাওলানা সাইয়্যেদ আহমাদ ইউসুফ বিন্নুরি (গত ৯ মার্চ ২০২৩ শুক্রবার ড. মাওলানা সাইয়্যেদ আহমাদ ইউসুফ বিন্নুরি(হযরত মাওলানা ইউসুফ বিন্নুরি রহ. এর নাতি ও জামিয়া বিন্নুরি টাউন, করাচির নায়েবে মুহতামিম) নবি করিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর "Political Life" (রাজনৈতিক জীবন) বিষয়ে "Institute Of Business Management" (ইনস্টিটিউট অব বিজনেস ম্যানেজম্যান্ট) এ ছাত্রদের উদ্দেশ্য বক্তব্য রেখেছেন। তাখাসসুস ফি উলুমিল হাদিসের ছাত্র মুহাম্মাদ তায়্যিব হানিফ উক্ত বক্তব্যটি রেকর্ড করে লিখন-শৈলীতে ঢেলে সাজিয়েছেন। অধিক কল্যাণ বিবেনায় পাঠকবৃন্দের উদ্দেশ্যে এখানে পত্রস্থ করা হচ্ছে।)