বর্ষ: ১, সংখ্যা: ২
জুমাদাল আখিরাহ ১৪৪৭ | সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর- ২০২৫
সরলতার সোনালি দিগন্তে নববী জীবনের চিরন্তন প্রতিচ্ছবি মাওলানা মুহাম্মদ মুজীবুর রহমান দেওদুরগী উস্তায, দারুল উলূম হায়দ্রাবাদ
আজ সর্বত্র দুনিয়ার জাঁকজমক ও প্রাচুর্যের স্রোত বইছে। প্রত্যেকে ভোগ-বিলাসের কামনা করছে, সবাই পার্থিব জীবনের ভোগ থেকে সর্বাধিক উপকৃত হওয়ার প্রত্যাশায় মত্ত। প্রত্যেক মানুষ সুখ-সুবিধার সামগ্রী আহরণের চেষ্টায় লিপ্ত, দুনিয়ার আরাম-আয়েশে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। ধনী হোক বা দরিদ্র—সবাই একই চিন্তায় ডুবে আছে, কিভাবে দুনিয়ার ভোগের উপকরণ বাড়ানো যায়? কিভাবে তার জীবন ভৌতিক সম্পদের বিচারে মানসম্মত ও দৃষ্টান্তমূলক হয়ে ওঠে? এইভাবেই মূল্যবান জীবন ক্ষণিক দুনিয়ার চিন্তায় কেটে যাচ্ছে, অথচ প্রতিটি দিন মানুষকে পরপারের দিকে টেনে নিচ্ছে।
কিন্তু একজন মুসলমান হিসেবে আমাদের উপর এ দায়িত্ব বর্তায় যে, ভোগ-বিলাসের সামগ্রী অর্জনের ক্ষেত্রে আমরা আমাদের প্রিয় নবী ﷺ -এর জীবনধারা জানব এবং তাঁর আদর্শকে গ্রহণের চেষ্টা করব। কিভাবে তিনি ﷺ দুনিয়ার সম্পদ ও ভোগের উপকরণ হাতে থাকা সত্ত্বেও এ সকল বিষয় থেকে বিমুখ ছিলেন; জীবনের প্রয়োজনে অল্প পরিমাণ ব্যবহার করেই দুনিয়ার জন্য অমলিন দৃষ্টান্ত রেখে গিয়েছেন। সেসব দৃষ্টান্তে সমগ্র মানবজাতির জন্য রয়েছে আদর্শ জীবনপথ, যা অবলম্বন করে একজন সত্যিকার মুসলিম নিজের পরকালের জীবনকে সুন্দর করতে পারে।
কিন্তু দুঃখজনক হলো, যে সব ঘটনা নবী করীম ﷺ -এর সংযমী জীবনের উজ্জ্বল নিদর্শন, যা আমাদের জীবনের জন্য বাস্তবিক অনুকরণযোগ্য এবং কর্মপালনে উদ্দীপক হয়ে উঠতে পারত আমরা অনেকে সেগুলোকে নিছক গল্পকাহিনী মনে করছি। তাই অত্যন্ত প্রয়োজন হলো আমরা যেন সেই ঘটনাগুলোকে বাস্তব জীবনের প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করছি। জীবন যখন নানা পরিস্থিতিতে জর্জরিত হয়, তখন সেই স্মৃতিগুলো স্মরণ করে হৃদয় ও মনকে ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতায় পরিপূর্ণ করাই আমাদের কর্তব্য।
নবী করীম ﷺ -এর জীবন এক আলোকিত কাব্য, আর তার উজ্জ্বলতম রত্ন হলো তাঁর স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সংযম। অপচয় ও আড়ম্বর থেকে মুক্ত সেই জীবন ছিল পরিমিতির দৃষ্টান্ত, যেখানে অন্তর ভরা ছিল ধৈর্যের সৌন্দর্যে আর জিহ্বা সিক্ত ছিল কৃতজ্ঞতার সুরে। আমাদের জন্য প্রকৃত আদর্শও তো এই তাঁর সরল ও সংযমী জীবনকে আঁকড়ে ধরা।
নবী করীম ﷺ -এর শয্যা
যখন মানুষের দেহ বিলাসের স্পর্শে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন সামান্য কষ্টও তার কাছে পর্বতের মতো ভারী মনে হয়; দুঃখ-ক্লেশের আঁধারে হাসি মুখে বেঁচে থাকা হয়ে ওঠে দুরূহ। আরাম-আয়েশের উপকরণের ভেতর শয্যা-বালিশও একটি প্রধান উপাদান।
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْعُودٍ رضي الله عنه كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يَرْتَاحُ عَلَى حصِيرٍ خَشِنٍ، فَظَهَرَتْ آثَارُهُ عَلَى جَسَدِهِ الْمُبَارَكِ، فَتَأَثَّرْتُ وَقُلْتُ: «يَا رَسُولَ اللَّهِ، لَوْ أَذِنْتَ لِي لَأَتَيْتُكَ بِفِرَاشٍ نَاعِمٍ فَقَالَ ﷺ بِصَوْتٍ رَخِيمٍ وَوَاثِق مَا دُنْيَايَ؟ أَنَا كَذَلِكَ السَّائِحُ الَّذِي يَتَوَقَّفُ ظِلَّ شَجَرَةٍ فِي الْحَرِّ الشَّدِيدِ لِقَلِيلٍ، ثُمَّ يَسِيرُ فِي سَفَرِهِ
হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বর্ণনা করেন—একবার নবী করীম ﷺ একটি মোটা চাটাইয়ের ওপর বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সেই রুক্ষ চাটাইয়ের দাগ মুবারক শরীরে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। এ দৃশ্য দেখে তাঁর হৃদয় কেঁপে উঠল। তিনি বললেন:
“হে আল্লাহর রাসূল! যদি অনুমতি দেন, আমি আপনার জন্য একটি নরম বিছানা পেতে দিই।”
কিন্তু নবী করীম ﷺ কোমল অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন:
“আমার দুনিয়ার সাথে সম্পর্কই বা কী? আমি তো সেই পথিকের মতো, যে প্রখর গ্রীষ্মে ক্লান্ত শরীর নিয়ে গাছের ছায়ায় অল্পক্ষণ আশ্রয় নেয়, তারপর আবার যাত্রায় বেরিয়ে পড়ে।” সীরাত ইবনে হিশাম – খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩২৫-৩২৬, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া – ইবনে কাসীর, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৫২-৫৩
এমনই গভীর তাৎপর্যময় কথা তিনি ﷺ একবার হযরত আয়েশা (রাঃ)-কেও বলেছিলেন, যখন তিনি তাঁর জন্য নরম শয্যা বিছিয়ে দিয়েছিলেন। (মিশকাত: ৪৪২, আল-ওফা ২/৪৭৫)
মাওলানা মানাজির আহসান গিলানি (রহঃ) এ সত্যকে চমৎকারভাবে এভাবে ব্যক্ত করেছেন—
“যার কাছে মাটির বিছানা ছাড়া আর কিছুই নেই, সে যদি মাটিতেই শোয়, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। কিন্তু যার ক্ষমতা রয়েছে সোনার সিংহাসনে শোয়ার, অথচ সে নিজেকে মাটিতেই সমর্পণ করে—তার সেই শোয়া যেন খাঁটি সোনার মতো, যার ভেতর নেই কোনো ভেজাল।” (আন-নবীউল খাতিম: ৫২)
হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর শয্যার কথা স্মরণ করে বলেন—
“রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর বিছানা ছিল চামড়ার, আর তার ভেতর ভরা থাকত খেজুর পাতার আঁশ। আল বিদায় ওয়ান নিহায়া –খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৫২-৫৩
পোশাকে সরলতা
রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর পোশাকে ছিল না আভিজাত্যের ঝলক; ছিল সরলতার সৌন্দর্য। হযরত উম্মে সালামা (রাঃ) বর্ণনা করেন—তাঁর কাছে সবচেয়ে প্রিয় ছিল সাধারণ এক কুর্তা। (আল-ওফা ২/৫৬৩)
হযরত আয়েশা (রাঃ) একদিন আবু বুরদা (রাঃ)-কে দুটি পোশাক দেখিয়ে বললেন—একটি মোটা চাদর, আর একটি মোটা লুঙ্গি। চোখ ভিজে উঠল স্মৃতির আবেগে, তিনি বললেন—
“এ দুটি সাধারণ পোশাকেই রাসূলুল্লাহ ﷺ দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন।” (আল-ওফা ২/৫৬৫)
তিনি ﷺ বাহ্যিক চাকচিক্য, দামি বস্ত্র কিংবা অহংকারমিশ্রিত সাজসজ্জা থেকে ছিলেন দূরে। একবার এক সাহাবী (রাঃ) ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে তাঁকে একটি দামী পোশাক উপহার দিলেন। নবী করীম ﷺ তাতে নামাজ পড়লেন, কিন্তু নামাজ শেষে সেটি খুলে ফেরত দিয়ে দিলেন। তিনি ﷺ বললেন—
“এটি সরিয়ে নাও, এটি আমার নামাজে মনোযোগ নষ্ট করেছে।” (আল-ওফা: ৫৬৪)
খাবারে সরলতা
মানবদেহ টিকে থাকার জন্য খাবারের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। তবে প্রকৃত কল্যাণকর খাবার সেটাই, যা মানুষকে ইবাদতের শক্তি দেয়, আল্লাহর আনুগত্যে অটল রাখে। জীবনের মূল উদ্দেশ্য তো ভোগ নয়—ইবাদত। মানুষ যখন ইবাদতের মহৎ লক্ষ্য ভুলে গিয়ে শুধু ভোগ-বিলাসের পেছনে ছুটে বেড়ায়, তখন হালাল-হারামের সীমা ভেঙে যায়, খাবার হয়ে ওঠে ক্ষতির কারণ; আরাম-আয়েশের আড়ম্বর ডেকে আনে অপচয় ও বিলাসিতা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ খাবারে ছিলেন বিস্ময়করভাবে সতর্ক। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন—
“তিনি ﷺ সাধারণত যবের রুটি আর সিরকা খেতেন।” (আল-ওফা ২/৫৯৮)
তাঁর দোয়া ছিল—
“হে আল্লাহ! মুহাম্মদের পরিবারের রিজিক কেবল জীবনধারণের পরিমাণে দাও।” (মিশকাত: ৪৪০) এমনকি পাহাড়গুলোকে সোনায় রূপান্তরের প্রস্তাব এলে তিনি ﷺ প্রার্থনা করেছিলেন—
“হে আমার প্রভু! চাই যে একদিন খেয়ে শুকরিয়া আদায় করি, আরেকদিন না খেয়ে অশ্রুভরা প্রার্থনা করি।” (মিশকাত: ৪৪২)
এই শিক্ষা প্রভাব ফেলেছিল সাহাবায়ে কেরামের জীবনেও।
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) একবার ভাজা মাছের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন—
“রাসূলুল্লাহ ﷺ দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন, অথচ তিনি যবের রুটিও পেট ভরে খাননি।” (মিশকাত: ৪৪৭)
ধনাঢ্য সাহাবী আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ)-এর সামনে একদিন রুটি ও মাংস আনা হলে তিনি অঝোরে কাঁদলেন। কারণ জানতে চাইলে বললেন—
“রাসূলুল্লাহ ﷺ দুনিয়া থেকে চলে গেছেন, অথচ তিনি ও তাঁর পরিবার কখনো যবের রুটি পেট ভরে খাননি। আমাদের জন্য এই বিলম্বিত প্রাচুর্যে কোনো কল্যাণ নেই।” (আল-ওফা ২/৪৮১)
একবার হযরত উমর (রাঃ) খুতবা দিচ্ছিলেন, তিনি বললেন:
“মানুষ দুনিয়া থেকে কত সুবিধা ভোগ করছে! অথচ আমি দেখেছি, দিনের পর দিন কেটে যেত কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর ঘরে সামান্য খেজুরও থাকত না।” (আল-ওফা ২/৪৮০)
এঁরা-ই ছিলেন সেই মহান ব্যক্তিত্ব, যারা দুনিয়ার প্রাচুর্যকে প্রকৃত কল্যাণ মনে করতেন না। এমনকি হযরত উমর (রাঃ)—এক সুবিশাল ইসলামী সাম্রাজ্যের শাসক হয়েও—জীবন কাটিয়েছেন সরলতায়, জাগতিক চাকচিক্য থেকে দূরে থেকে।
জীবনযাপনে সরলতা
রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন অনাড়ম্বর সরলতার জীবন্ত দৃষ্টান্ত। গৃহে তিনি নিজেই কাজ করতেন, ছাগলের দুধ দোহন করতেন এবং পরিবার-পরিজনের দায়িত্ব ভাগ করে নিতেন। সফরে থাকলেও কখনো আলাদা মর্যাদা নিতেন না; বরং সাহাবিদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতেন। নতুন আগন্তুকরা তাই তাঁকে প্রথমবারে ঠাহর করতে পারত না; কারণ তাঁর বিশেষত্ব চাকচিক্যে নয়; ছিল বিনয়ে ও সংযমে।
তাঁর সমগ্র জীবন আমাদের জন্য শিক্ষা। সীরাত কেবল শোনার বিষয় নয়; বরং অনুসরণের আহ্বান। যদি আমরা তাঁর সরলতা ও বিনয়কে জীবনে ধারণ করি, তবে ব্যক্তি জীবনে আসবে প্রশান্তি, পরিবারে সৌহার্দ্য, আর সমাজে শান্তির আলো ছড়িয়ে পড়বে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে নবী করীম ﷺ-এর সেই মহৎ জীবনধারা আঁকড়ে ধরার তাওফিক দান করুন। আমীন।
ভাষান্তর : মাওলানা আতিক হাসান
"শান্তি ও নিরাপত্তা সংকট এবং সিরাতে তাইয়্যিবার আলোকে সমাধান" —ড. বশির আহমদ রিন্দ
রাসুল (সা.) এর জন্মতারিখ এর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ লেখক: মুফতি রেজাউল হক দা.বা. শায়খুল হাদিস ও মুফতি, জামিয়া দারুল উলুম যাকারিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা