বর্ষ: ১, সংখ্যা: ২
জুমাদাল আখিরাহ ১৪৪৭ | সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর- ২০২৫
ফাতাওয়া ও মাসায়িল নিকাহ-তালাক
আবু তালহা
মুন্সিগঞ্জ
দুধ বোন কিংবা দুধ বোনের অন্য বোনেরা দুধ ভাইদের সাথে দেখা করতে পারবে কি?
প্রশ্ন -১১২ : দুধ ভাই-বোন সম্পর্কে মামাতো ভাই ও ফুফাতো বোন। জানার বিষয় হলো দুধ বোন দুধ ভাইদের সাথে অথবা দুধ বোনের অন্য বোনেরা দুধ ভাইদের সাথে দেখা করতে পারবে কিনা?
উল্লেখ্য যে, উপরোক্ত সুরতে ফুফাতো বোন মামির দুধ পান করেছে।
উত্তর : দুধ পানের সম্পর্ক দ্বারা ওই ধরনের সমস্ত লোক হারাম হয়ে যায়, বংশীয় সম্পর্কের কারণে যাদের সাথে বিবাহ হারাম। দুধ সন্তানের জন্য দুধ মায়ের ছেলে- মেয়ে দুধ সম্পর্কীয় ভাই-বোন হাওয়ায় তাদের সাথে বিবাহ জায়েয নেই। ফলে তাদের সাথে পর্দা করা জরুরী নয়। পক্ষান্তরে দুধ সন্তানের অন্য ভাই দুধ-মায়ের মেয়ের সাথে অথবা দুধ সন্তানের অন্য বোন দুধ মায়ের ছেলের সাথে বিবাহ জায়েয বিধায় পর্দা করা লাগবে।
সুতরাং প্রশ্নোক্ত সুরতে দুধ বোন (ফুফাতো বোন) দুধ ভাই (মামাতো ভাই) দের সাথে দেখা করতে পারবে। তবে দুধ বোনের অন্যান্য বোনেরা (ফুফাতো বোনের অন্যান্য বোনেরা) দুধ ভাই( মামাতো ভাই) দের সাথে দেখা করতে পারবে না।
(رد المحتار(٣٩٩/٤ مكتبة الأزهر)
لو كانت أم البنات أرضعت أحد البنين وأم البنين أرضعت إحدى البنات لم يكن للابن المرتضع من أم البنات أن يتزوج واحدة منهن،وكان لاخوته أن يتزوجوا بنات الاخرى الا الابنة التي أرضعتها امهم وحدها لانها اختهم من الرضاعة.
-সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৪৪৫;
ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ৪/৩৬৫;
আল ফিকহুল হানাফি ফী ছাওবিহীল জাদীদ ২/১৫৬
মুহাম্মাদ খালেদ সাইফুল্লাহ
নবাবগঞ্জ, দিনাজপুর
রাগের বশে স্ত্রীর অনুপস্থিতিতে তিন তালাকের বিধান
প্রশ্ন - ১১৩ : যদি স্বামী তার পিতা-মাতা বা আত্মীয়-স্বজনদের সাথে ঝগড়া বা রাগের বশে তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে দেয়, তখন ঐ সময় তার স্ত্রী সেখানে উপস্থিত ছিল না, তাহলে কি বিধান? আর যদি কিছুদিন বা বছর পরে শুনে তাহলে কি বিধান?
উল্লেখিত বিষয়ে শরিয়তের বিধান জানিয়ে বাধিত করবেন।
উত্তর : ইসলামি শরীয়তে সবচেয়ে ঘৃণিত হালাল হলো তালাক। হাসি-ঠাট্টা বা রাগান্বিত অবস্থায় তালাক দিলেও তৎক্ষণাৎ তালাক সংঘটিত হয়ে যায়। স্ত্রী উপস্থিত থাকুক বা অনুপস্থিত। তার জানা, না জানার সাথে তালাক সংঘটিত হওয়ার কোনো সর্ম্পক নেই।
সুতরাং স্বামী রাগের বশে স্ত্রীর অনুপস্থিতিতে তিন তালাক দিয়ে থাকলে তিন তালাক সংঘটিত হয়ে গেছে এবং তাদের বিবাহ স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় তালাকের পর তারা যদি পরস্পর স্বামী-স্ত্রীসূলভ কোনো আচরণ করে থাকে তাহলে তা ব্যাভিচার গণ্য হবে। তাই মাসআলা জানার সাথে সাথে উভয়ের পৃথক হয়ে যেতে হবে এবং কৃত ব্যাভিচারের জন্য খাঁটি দিলে তাওবা করতে হবে।
(الكافي في الفقه الحنفى ٣/١٠٠٩)
قدمنا أن الطلاق على ثلاث ضرر وذكرنا أن جمع الطلقات الثلاث بكلمة واحدة يوقع الطلاق ثلاثا ونقلنا أقوال المذاهب الأربعة في الباب موافقة لما فعل عمر رضي الله عنه ولم يخالفه أحد من الصحابة.
-সহীহ মুসলিম , হাদীস ১৪৭২ ;
মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা , হাদীস ১৮০৮৭ ;
মুহাম্মাদ সাব্বির আহমাদ
নরসিংদী
ঝগড়ার সময় যদি স্বামী স্ত্রীকে বলে আমি তো তোমাকে ছেড়ে দিয়েছি তাহলে কি তালাক পতিত হবে?
প্রশ্ন - ১১৪ : স্বামী–স্ত্রীর ঝগড়ার সময় স্বামী স্ত্রীকে বলল আজ আমি তোমাকে ছেড়ে দিবো, তারপর আর কিছু বলেনি শুধু কয়েকটি গালি দেয়, অতপর দ্বিতীয় দিন আবার স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ার সময় এক পর্যায়ে স্বামী স্ত্রীকে বলে আমি তো তোমাকে ছেড়ে দিয়েছি , এখনো বাড়িতে রয়েছ কেন? এই কথা শুনে স্ত্রী স্বামীকে একটি গালি দেয়। এ ঘটনার পর স্বামীকে জিঙ্গেস করা হয় আপনি কি আপনার স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন? স্বামী বলল আমি এ কথা সত্যি সত্যি বা মন থেকে বলিনি। উক্ত বিবরণের উপর ভিত্তি করে শরিয়তের বিধান জানিয়ে বাধিত করবেন
উত্তর : ইসলামি শরিয়ামতে আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক হালাল বস্তুসমূহের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্টতম হালাল হলো তালাক। তাই তালাক প্রদানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্ছ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী।অতএব , প্রশ্নোক্ত সুরতে স্ত্রীর ওপর এক তালাকে রজয়ী পতিত হয়েছে । এমতাবস্থায় চাইলে ইদ্দতের ভেতর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারবে । তবে স্বামীর জন্য মাত্র দুই তালাকের অধিকার অবশিষ্ট থাকবে । পরবর্তীতে কখনো দুটি তালাক দিলে স্থায়ীভাবে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে ।
((كتاب الأصل 4/513))
ولو قال لها : قد طلقتك واحدة أمس وهو كاذب كانت في القضاء طالقا . وأما فيما بينه وبين الله فهي إمرأته .
-সূরা বাকারা ২৩১;
সুনানে তিরমিজী, হাদীস: ১১৮৪ ;
মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস: ১৮৪৫৫;
ফাতাওয়া বাযযাযিয়া ১০/১১১ ;
রদ্দুল মুহতার ৩/২৩৮ ;
ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ৪/৪০১
আতাউল্লাহ
বি-বাড়িয়া
তিন তালাক দিলে এক তালাক হয়। কথাটি কি সঠিক? 󠆾
১১৫ প্রশ্ন : আমার আপন চাচাতো বোন যার বিবাহ প্রায় দুইবছর আগে হয়েছে। এমনকি তার একটি ছোট মেয়ে ও আছে। ঘটনাক্রমে তার স্বামী তাকে রাগের মাথায় তিন তালাক দেয়। এখন সে চাচ্ছে তাকে ফিরিয়ে নিতে।
আমার জানার বিষয় হলো,
১. কোনো হিলা বিবাহ ছাড়া অর্থাৎ দ্বিতীয় কোনো স্বামী গ্রহণ করা ছাড়া মহিলা তার স্বামীর কাছে ফিরে যেতে পারবে কিনা?
২. তিন তালাক দিলে এক তালাক হয়। কথাটি সঠিক কি না?
উপরোক্ত বিষয়ে শরীয়াতের বিধান জানিয়ে বাধিত করবেন।
উত্তর : ইসলামি শরিয়ামতে হালাল কাজ সমূহের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হালাল কাজ হলো তালাক। আর এক মজলিসে তিন তালাক দিলে তিন তালাকই পতিত হয়ে যায়, চাই তা এক শব্দে হোক বা ভিন্ন ভিন্ন শব্দে হোক। এর কারণে স্ত্রী স্বামীর জন্য সম্পূর্ণ হারাম হয়ে যায়। তবে যদি উক্ত মহিলা এই স্বামীর ইদ্দত শেষ করে অন্যত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। এবং দ্বিতীয় স্বামীর সাথে কমপক্ষে একবার দৈহিক মিলনের পর উক্ত স্বামী মারা যায় অথবা স্বেচ্ছায় তালাক দেয় এবং দ্বিতীয় স্বামীর ইদ্দত শেষ হয়। তাহলে এমতাবস্থায় তাদের জন্য নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সুতরাং , ১/তিন তালাকপ্রাপ্তা মহিলা প্রথম স্বামীর ইদ্দত শেষ করে অন্য কোন ব্যক্তির বিবাহে আবদ্ধ হয়ে কমপক্ষে একবার দৈহিক মিলন হওয়ার পর দ্বিতীয় স্বামীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ হওয়া বা স্বামী মৃত্যু বরণ করার পর ইদ্দত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রথম স্বামীর নিকট ফিরে আসতে পারবে না।
দুই বা তিন তালাক দিলে এক তালাক হয় কথাটি সঠিক নয়। বরং এক মজলিসে এক শব্দে বা ভিন্ন শব্দে তিন তালাক দিলে তিন তালাকই পতিত হয়। যা অধিকাংশ ফকিহ ও মুহাদ্দিস সাহাবী তাবেঈ এবং মুজতাহিদ ইমামগণ, বিশেষ করে চার মাজহাবের ইমামদের মত। এমনকি ১৩৯৭ হিজরিতে সৌদি আরবের বড় বড় উলামা মাশায়েখদের ফিকহী বোর্ডের সিদ্ধান্তও এটি।
উল্লেখ্য, বিনা দোষে বা অপ্রয়োজনে তালাক দেওয়া ও এক মজলিসে একত্রে তিন তালাক দেওয়া কবিরা গুনাহ।
(كتاب الأصل 4/ 466 )
وإذا طلق الرجل امرأته ثلاثاً جميعاً فقد خالف السنة وأثم بربه وهي طالق ثلاثاً، لا تحل له حتى تنكح زوجاً غيره ويدخل بها. بلغنا ذلك عن رسول الله ، وعن علي بن أبي طالب وعن عبدالله بن مسعود وعن عبدالله بن عباس وعن غيرهم من أصحاب رسول الله (صلى) . فإن دخل بها أو لم يدخل فهما سواء. وكذلك إذا كان لم يدخل بها فطلقها ثلاثاً في كلمة واحدة.
-সূরা বাকারা ২২৯-২৩০;
সহীহুল বুখারী, হাদীস ৫০৬২; সহীহ বুখারী , হাদীস ৫২৬১
আব্দুল মান্নান
বখশি বাজার
আচ্ছা, ঠিক আছে, দিলাম” বললে কি তালাক পতিত হবে?
প্রশ্ন - ১১৬ : স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া ও কথা কাটাকাটি হয়, যেখানে স্ত্রী ছিল প্রচণ্ড আক্রমণাত্মক। একপর্যায়ে স্ত্রী স্বামীকে এই বলে বার বার চাপ দিতে থাকে যে “তাহলে আমাকে ছাইড়া দে, তালাক দিয়া দে!” সবর করতে করতে একপর্যায়ে স্বামী বলে বসে “আচ্ছা, ঠিক আছে, দিলাম।” সে এক তালাক বা তিন তালাক বা বায়েন এমন কোনো শব্দ মুখে উচ্চারণ করেনি।
প্রশ্ন হলো :
১. তিন তালাক হয়ে গেছে কি না?
২. এক তালাক পতিত হয়েছে কিনা?
৩. এরপর তারা পুনরায় সংসার করছে। এক্ষেত্রে তাদের কি নতুন করে বিবাহ দোহরানো উচিৎ ছিল কি না?
অনুগ্রহ করে জানাবেন।
উত্তর : ইসলামি শরিয়ামতে হালাল বিধানসমূহের মধ্যে সবচেয়ে গর্হিত বিষয় হলো তালাক এবং স্ত্রী কর্তৃক স্বামীর নিকট তালাক চাওয়া বা দাবি করা কবিরা গুনাহ। তবে স্ত্রীর তালাক চাওয়ার উত্তরে স্বামী যদি "দিলাম" বলে, তাহলে একটি তালাক পতিত হয়। এমতাবস্থায় স্বামী স্ত্রী একসাথে বসবাস করলে বা স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া মূলক কিছু করলে শরিয়তে তার অনুমোদন রয়েছে; বিবাহ নবায়নের প্রয়োজন নেই। তবে পরবর্তীতে স্বামী আর দুটি মাত্র তালাকের ইখতিয়ার রাখবে।
সুতরাং প্রশ্নোক্ত সুরত সহিহ হলে:
১-২ একটি তালাক পতিত হয়েছে; তিন তালাক হয়নি৷
৩. বিবাহ দোহরানোর প্রয়োজন নেই; আগামীতে দুই তালাক দিলে স্থায়ীভাবে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে।
(الدر المختار : ٣/ ٣٩٤: ايچ ايم سعيد)
قالت لزوجها : طلقني فقال : فعلت طلقت. فإن قالت: زدني فقال : فعلت طلقت أخرى.
-সূরা বাকারা: ২২৯ ; সূরা তালাক: ১; সুননে আবু দাউদ, হাদীস: ২২২৬;
রদ্দুল মুহতার ৩/২৯৪
"শান্তি ও নিরাপত্তা সংকট এবং সিরাতে তাইয়্যিবার আলোকে সমাধান" —ড. বশির আহমদ রিন্দ
রাসুল (সা.) এর জন্মতারিখ এর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ লেখক: মুফতি রেজাউল হক দা.বা. শায়খুল হাদিস ও মুফতি, জামিয়া দারুল উলুম যাকারিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা