বর্ষ: ১, সংখ্যা: ২
জুমাদাল আখিরাহ ১৪৪৭ | সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর- ২০২৫
নবিজির সুমহান চরিত্র হযরত মাওলানা শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভি রহ.
১. হাদিস শরিফে এসেছে, যখন সাহাবায়ে কেরাম উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর নিকট জিজ্ঞেস করলেন, "রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্র কেমন ছিল, যাঁর প্রশংসা আল্লাহ তাআলা কুরআনে করেছেন?" সিদ্দিকা বললেন: 'তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন।" অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা যেসব জিনিসকে ভালো বলেছেন, সেগুলিই তাঁর প্রিয় ছিল। যেসব জিনিসকে আল্লাহ তাআলা খারাপ বলেছেন, তিনি সেগুলো অপছন্দ করতেন।
কতিপয় উলামায়েকেরাম বলেন, রাসূলের 'উত্তম চরিত্র' (خُلق عظيم) এর ব্যাখ্যা হচ্ছে কুরআনের এই আয়াত:
خذ العفو وأمر بالعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الجُهَلِينَ
(হে নবী!) তুমি ক্ষমাপরায়ণতা অবলম্বন কর এবং (মানুষকে) সৎকাজের আদেশ দাও আর অজ্ঞদের অগ্রাহ্য করো। (আল-আ'রাফ: ১৯৯)
এই পথেই মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানানো এবং ইসলামকে সমুন্নত করাই তাঁর গুরুতর দায়িত্ব ছিল। এবং অন্য হাদীসে এসেছে:
إنما بعثت لأتمم مكارم الأخلاق
"আমি প্রেরিত হয়েছি উত্তম চরিত্রকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্য।" (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৮৯৫২)
২. হাদিস শরিফে এসেছে, যখন خذ العفو وامر بالعرف এই আয়াত নাজিল হলো, তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) এর কাছে এর ব্যাখ্যা জানতে চান। তিনি বললেন: "আপনাকে উত্তম চরিত্র শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, যেমন: সম্পর্ক ছিন্নকারীর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা, বঞ্চনাকারীকে দান করা এবং অত্যাচারীকে ক্ষমা করা। (সহিহুল বুখারী, ৩/১৯৫, হাদিস নং, ৪৬৪৩, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ)
যারা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জীবনী সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন, তাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে, তিনি এই সব গুণাবলী পূর্ণভাবে লাভ করেছিলেন। এরচেয়ে বেশি অর্জন করা কোনো মানবের সাধ্যে নেই।
৩. তাবারানী, হাকিম, ইবনে হিব্বান, বায়হাকী ও অন্যান্য হাদিস বিশারদগণ বর্ণনা করেন: একজন ইহুদি আলেম যাঁর নাম ছিল' যায়েদ ইবনে সা'নাহ' তিনি বলেন: আমি পূর্বের কিতাবসমূহে শেষ নবীর বিবরণ দেখেছিলাম এবং তাঁর সব গুণাবলী রাসূলুল্লাহর মধ্যে দেখেছিলাম, তবে দুইটি বিষয়ে আমার জানা ছিল না:
১. রাগ হলে ধৈর্য ধারণ করেন কিনা।
২. কারও কটু বাক্য শুনলে অস্থির হয়ে যান কি না; না কি আরও নম্র হন।
সুতরাং আমি চাচ্ছিলাম, কোনোভাবে বিষয় দুটো পরীক্ষা করবো।
ঘটনাক্রমে একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছ থেকে বাকিতে খেজুর নিয়েছিলেন। ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ও নির্ধারণ করা হলো। আমি নির্ধারিত সময় আসার দু-তিন দিন পূর্বে আমার পাওনা দাবি করে বসি। অতঃপর আমি লক্ষ্য করলাম যে, রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শুনেও চুপ রয়েছেন, এবং এটাও বলছেন না যে 'এখনো তো তোমার প্রতিশ্রুত সময় আসেনি; এর আগেই তুমি কেন পাওনা দাবি করছ? অতপর আমি রুঢ় ভাষায় দাবি করলাম এবং লক্ষ্য করলাম যে, সাহাবায়ে কেরাম ক্ষেপে যাচ্ছেন এবং কেউ কেউ কটুবাক্য ও শোনাতে লাগলেন; কিন্তু রাসুল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) রাগান্বিত হননি। এমনকি আমি একথাও শুনিয়েছিলাম যে, ‘তোমার গোত্র কি এভাবে তালবাহানা করে ঋণ পরিশোধ করে?" সম্ভবত ইতোপূর্বে কেউই সহজে ঋণ আদায় করতে পারেনি।’ একথা শুনে উমর (রাঃ) রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে যান। এবং আমি উঠে রাসুল (সা্ঃ) এর জামা ও চাদর মোবারক নিজের দিকে টানতে শুরু করি এবং রেগে গিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে বলি: এখনই উঠে আমার ঋণ পরিশোধ করুন। রাসুল (সা্ঃ) উঠে দাঁড়ালেন এবং ওমর (রা্ঃ) উত্তেজিত হয়ে তলোয়ার হাতে আমার মাথার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন হে আল্লাহর দুশমন। ছাড়, বলছি; নাহয় তোর গর্দান উড়িয়ে দেবো। রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃদু হেসে ওমর (রা্ঃ)'র দিকে তাকিয়ে ইরশাদ করলেন: 'তোমার থেকে এমনটি আশা করিনি'; তোমার উচিত ছিল তার ঋণ উত্তম তরিকায় সহজেই পরিশোধের বিষয়টি আমাকে বুঝিয়ে বলা এবং তাকে বিনম্র ভাষায় দাবি করতে বলা। কিন্তু এর বিপরীতে তুমি এসব কী বলছ? হযরত ওমর (রা্ঃ) অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এর চেয়ে বেশি ধৈর্য আমার নেই। আপনার যদি অনুমতি থাকে তাহলে আমি তার ঋণ পরিশোধ করে দিব। রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করলেন: যাও তার সকল ঋণ পরিশোধ করে দাও এবং তোমাদের অশোভনীয় ও রুঢ় ব্যবহারের প্রতিদান স্বরূপ বাড়তি বিশ সা ও তাকে দিয়ে দাও। সে (ইয়াহুদী) ব্যক্তি বলল, "আমি এ কথা শোনামাত্র ঈমান আনয়ন করি এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওতের স্বীকৃতি দিয়েছি।" (আল মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন; ৭/৩৪৫, আররিসালাহ)
৪: সহীহ রেওয়ায়াতে হযরত আবু হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু 'আনহু) থেকে বর্ণিত: একদিন রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সঙ্গে বসে কিছু আলাপচারিতা করছিলেন, অতপর তিনি উঠে ঘরের দিকে চলে গেলেন। আমি তাঁর সঙ্গে রওয়ানা হলাম। পথে এক বেদুঈন ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পেল এবং তিনি তাঁর চাদরটি তাঁর মাথা থেকে এত জোরে টেনে ধরলেন যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গলা লাল হয়ে গেল এবং প্রায় তাঁর মাথা দেয়ালে লেগে যাচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই বেদুঈনের দিকে ফিরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার উদ্দেশ্য কী? বলো!" সে বলল, "এই দুটি উট আমার জন্য খাদ্যে ভরে দাও। কারণ যে সম্পদ তোমার কাছে আছে তা আল্লাহর সম্পদ, সেটা তোমার বা তোমার পিতার সম্পত্তি নয়।' (সুনানু আবি দাঊদ , ২/৬৫৮, কিতাবুল আদব)
৫: তারিখে তাবারিতে উল্লেখ আছে যে, একবার সফরের সময় রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়েকেরামকে স্বীয় আশা ব্যক্ত করে ইরশাদ করলেন: "আজ আমি একটি ছাগলের কাবাব রান্না করতে চাই।" সবাই বলল: "খুব ভালো।" তারপর সাহাবাদের একজন বললেন:
"আমি ছাগলটি জবাই করবো।
"আরেকজন বললেন: "আমি চামড়া ছাড়াবো।"
তৃতীয়জন বললেন: "আমি মাংস কেটে প্রস্তুত করবো এবং কোঁচাবো।"
চতুর্থজন বললেন: "রান্নার দায়িত্ব আমার।"
এভাবে প্রত্যেকে একটি করে কাজ নিজের দায়িত্বে নিয়ে নিলেন, যেন তাড়াতাড়ি কাবাব প্রস্তুত হয়। সবাই কাজে লেগে গেলেন।
এদিকে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুপিচুপি উঠে গেলেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই জঙ্গলের ভেতর থেকে এক গাট্টি কাঠ সংগ্রহ করে নিয়ে এলেন।
সাহাবায়েকেরাম দেখে বললেন: "ইয়া রাসূলুল্লাহা আপনি এত কষ্ট করলেন কেন? এটা তো আমাদের মধ্যে যে কেউ করতে পারত।" তিনি ইরশাদ করলেন: "আল্লাহ তাআলা এটা অপছন্দ করেন যে কেউ তার সঙ্গীদের থেকে নিজেকে আলাদা করে বসে থাকুক এবং তাদের কাজে শরিক না হোক।" (খুলাসাতু সিয়ারি সায়্যিদিল বাশার: ৮৭)
৬: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অভ্যাস ছিল যে, তিনি যখন ফজরের নামাজ শেষ করতেন, তখন মদিনার লোকদের দাস-দাসীরা পানির পাত্র নিয়ে আসত, যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই পানিতে নিজের পবিত্র হাত রাখেন। এতে সেই পানি বরকতময় হয়ে যেত এবং ভারা সেই পানি নিজেদের খাবার ও পানীয়তে ব্যবহার করত।
কখনো শীতকালও হতো, আর পাত্রের সংখ্যাও অনেক হতো। সব পাত্রে হাত দেওয়ায় কষ্ট হতো, তবুও কারো মন খারাপ হোক এটা তিনি চাইতেন না। তাই তিনি সব পাত্রেই নিজের পবিত্র হাত রাখতেন। (সহিহুল মুসলিম, ২/ ২৫৬, হাদিস নং, ২৩২৪, ইসলামিয়্যাহ)
এগুলো ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উত্তম চরিত্রের কয়েকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যেগুলো আমাদের জন্যও অনুকরণীয় এবং আমাদের জীবনেও তা অনুসরণ করা উচিত।
ভাষান্তর : মাওলানা ফখরুদ্দিন ফাহিম
"শান্তি ও নিরাপত্তা সংকট এবং সিরাতে তাইয়্যিবার আলোকে সমাধান" —ড. বশির আহমদ রিন্দ
রাসুল (সা.) এর জন্মতারিখ এর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ লেখক: মুফতি রেজাউল হক দা.বা. শায়খুল হাদিস ও মুফতি, জামিয়া দারুল উলুম যাকারিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা