বর্ষ: ১, সংখ্যা: ২
জুমাদাল আখিরাহ ১৪৪৭ | সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর- ২০২৫
মক্কার গলিপথ থেকে বিশ্বসভ্যতার মশাল মাওলানা ইমদাদুল হাসান জায়েদ
মক্কার সেইসব গলিপথে, যেখানকার মাটি সূর্যের তাপে পুড়ে যেত, যেখানকার মানুষ অজ্ঞতা, অহংকার আর গোত্রকেন্দ্রিক বিরোধের অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল—সেখানেই ইতিহাসের সবচেয়ে আলোকোজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা।
সেই গলিপথগুলো একদিন দর্শন লাভ করেছিল এমন এক মানুষের, যিনি শুধু আরবের নয়; সমগ্র মানবজাতির ভাগ্য পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন। তাঁর নাম মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তাঁর পদসঞ্চালনে ছিল বিনয়, কিন্তু সেই পদচিহ্ন আজ অব্দি সভ্যতার সোনালি রোডম্যাপে অঙ্কিত।
কেউ কল্পনা করতে পারেনি যে, মরুসমুদ্রের এই নগরী একদিন বিশ্বসভ্যতার বাতিঘর হয়ে উঠবে। এখানে জন্ম নিয়েছিলেন এমন এক দিশারি, যিনি অন্ধকার যুগের সমাপ্তি টেনে মানবতাকে নতুন প্রভাত দেখিয়েছিলেন।
নবুওতের আলো যখন মক্কার ধূলিকণায় মিশে গিয়েছিল, তখনো কেউ জানত না, এই আলো কেমন করে পৌঁছে যাবে পারস্যের প্রাসাদ, রোমের দুর্গ, সিন্ধুর তীর আর আন্দালুসের রাজধানীতে।
মক্কার গলিপথে নবীজীর শৈশবের দিনগুলো ছিল নির্লিপ্ত অথচ ভাবগম্ভীর। পিতৃহারা শিশু মুহাম্মাদ যিনি দাদার কোলে, কাকার স্নেহে বড় হচ্ছেন; যিনি বাণিজ্যের কাফেলায় অংশ নিচ্ছেন; সততার পরিচয় দিচ্ছেন—এই সব দৃশ্য একদিন বিশ্বকে দেখাবে যে চরিত্রই আসল শক্তি আর সত্যনিষ্ঠাই সবচেয়ে বড় পুঁজি।
সেই সততার স্বাক্ষরেই তিনি পেলেন “আল-আমিন” উপাধি। আর এই চরিত্রের ভিত্তিতেই গড়ে উঠল একটি সভ্যতা—যা ন্যায়, সত্য ও দয়ার পতাকা উড়িয়েছিল।
মক্কার রাস্তাগুলো একসময় তাঁকে দেখল হেরা গুহার পথে চলতে। রাতের নীরবতায় তিনি চিন্তায় মগ্ন—মানুষ কেন এত বিভ্রান্ত? কেন সমাজে এত অন্যায়? কেন সত্য এত অপরিচিত?
আর তারপর হঠাৎ সেই মহামুহূর্ত—“ইকরা” নির্দেশে যে আলো তাঁর হৃদয় থেকে ছড়িয়ে পড়ল, তা আর কোনো সীমারেখায় আটকে থাকেনি। সেই ক্ষুদ্র গুহা, সেই মক্কার গলিপথ—এখান থেকেই ইতিহাসে জন্ম নিল এক নতুন দিগন্ত।
যখন তিনি মানুষকে ডেকেছেন—“বলো, আল্লাহ্ এক”—তখন শুরু হল শত্রুতা, নির্যাতন, উপহাস। কিন্তু এই গলিপথে দাঁড়িয়েই তিনি শেখালেন ধৈর্য, ক্ষমা আর অবিচলতা।
সাহসী বিলাল যখন কাবার প্রাঙ্গণে চরম নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন, তখন নবীজী শেখাচ্ছেন যে ঈমানের শক্তি দাস-প্রভুর সীমারেখা মুছে দেয়। অন্যদিকে আবু জাহলের ঘৃণাভরা দৃষ্টি আর আবু বকর রা.-এর অশ্রুসিক্ত দৃষ্টির মাঝেই জন্ম নিচ্ছে এক নতুন সমাজের বীজ।
ধীরে ধীরে এই গলিপথ থেকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল সত্যের সুর। যারা একসময় জুলুমের প্রতীক ছিল, তারা একে একে আলোর পথে আসতে লাগল। একসময় মক্কার সংকীর্ণ প্রান্তর ছাড়িয়ে মদিনার উন্মুক্ত বাতাসে নবীন সভ্যতার পতাকা উড়ল। হিজরতের ধুলোমাখা পদচিহ্ন আজো প্রমাণ করে—সভ্যতার গতি থামিয়ে রাখা যায় না।
মদিনায় দাঁড়িয়ে নবীজী গড়লেন এমন এক সমাজ যেখানে ছিল সমতা, ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার। মক্কার উপত্যকায় যে আলোর শিখা জ্বালানো হয়েছিল, সেটি তখন বিশ্বব্যাপী এক মশালে পরিণত হয়েছে।
শাসনব্যবস্থা থেকে ন্যায়বিচার, অর্থনীতি থেকে শিক্ষা—প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি রেখে গেছেন দৃষ্টান্ত, যা কালের গণ্ডি পেরিয়ে আজও আধুনিক বিশ্বকে আলো দেখায়।
আরবের বেদুইন সেই সভ্যতায় পৌঁছাল যেখানে বিদ্যা-বিজ্ঞান, সাহিত্য-সংস্কৃতিতে জন্ম নিল সোনালি যুগ। বাগদাদ, দামেস্ক, কায়রো, কর্ডোভা—সবখানে ছড়িয়ে পড়ল সেই আলো।
গ্রীক দর্শনের অন্ধকারে যখন ইউরোপ হোঁচট খাচ্ছে, তখন মুসলিম মনীষীরা আলোর মশাল হাতে অনুবাদ করছে, ব্যাখ্যা করছে, নতুন করে গড়ছে জ্ঞানের রাজপ্রাসাদ। মক্কার সেই ছোট্ট গ্রাম থেকে শুরু হওয়া যাত্রা তখন পরিণত হচ্ছে বিশ্বসভ্যতার মহান রেনেসাঁয়।
আজকের বিভ্রান্ত পৃথিবী, আজকের অস্থির সমাজ—সবখানে আবার সেই আলোর প্রয়োজন। মক্কার গলিপথ থেকে যে আলো ছড়িয়েছিল, সেটাই আজও একমাত্র দিশারি। আমাদের শিক্ষা, রাজনীতি, অর্থনীতি—সবখানে যদি আবার সেই আদর্শ ফিরিয়ে আনা যায়, তবে নতুন প্রভাত অবশ্যম্ভাবী।
এই আলো শুধু ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি মানবিকতা, ন্যায় ও শান্তির আলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন যে আদর্শ রেখে গেছে, তা কোনো জাতি, কোনো যুগের জন্য সীমিত নয়। তিনি ছিলেন সার্বজনীন, তিনি ছিলেন অনন্তকালীন।
তাই আজ আমাদের প্রত্যেককে আবার ফিরে তাকাতে হবে সেই গলিপথের দিকে, যেখানে ইতিহাসের সবচেয়ে পবিত্র পদচিহ্নগুলো খোদাই হয়ে আছে। মক্কার সেই গলিপথ যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন মানুষের চরিত্র, ধৈর্য আর সত্যনিষ্ঠাই পৃথিবীর গতিপথ পাল্টে দিতে পারে।
মক্কার গলিপথ থেকে যে মশাল জ্বালানো হয়েছিল, তা নিভে যায়নি, নিভবেও না। সেই আলো আজও আমাদের অন্তরে জ্বলে, যদি আমরা তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত হই। আর যখন আমরা সেই আলোর পথে হাঁটব, তখনই আমরা নতুন করে গড়তে পারব এক সভ্যতা—যার ভিত্তি হবে সত্য, ভালোবাসা ও ন্যায়।
মক্কার গলিপথ থেকে শুরু হওয়া সেই আলোর যাত্রা আজো চলছে—চলবে অনন্তকাল, যতদিন না মানুষ সত্যকে আলিঙ্গন করে মানবতার সোপানে উঠে আসে।
মক্কার সেই গলিপথ শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান নয়; এটি এক আধ্যাত্মিক প্রতীকের নাম। সংকীর্ণ পথ, মাটির দেয়াল, দারিদ্র্য আর বিভ্রান্তিতে মোড়া এক সমাজ—সব মিলিয়ে যেন মানবসভ্যতার অন্ধকার অধ্যায়ের প্রতিচ্ছবি। অথচ সেই অন্ধকারেই জন্ম নিয়েছিল এমন এক আলোর শিখা, যা পৃথিবীর বিস্তীর্ণ আকাশকে আলোকিত করেছিল।
নবীজীর জীবনের প্রথম দিকের ঘটনা যদি আমরা মনোযোগ দিয়ে দেখি, তবে একটি চমৎকার শিক্ষা পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ, একজন সৎ ব্যবসায়ী, একজন বিশ্বস্ত প্রতিবেশী। তাঁর মধ্যে ছিল মানবিক গুণাবলীর পূর্ণ বিকাশ।
এ থেকেই বোঝা যায়—কোনো মহান পরিবর্তনের জন্য প্রথম শর্ত হলো উচ্চমানের চরিত্র। কোনো শক্তি, কোনো সম্পদ বা ক্ষমতা নয়; বরং সত্যনিষ্ঠা, দয়া, বিনয় এবং ধৈর্যই একটি সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করতে পারে।
মক্কার গলিপথের সেই দৃশ্যগুলো আমাদের আজও ভাবায়। কেমন করে একজন একা মানুষ তাঁর চারপাশের গোত্রপ্রথা, ভ্রান্ত বিশ্বাস, সামাজিক অবিচারকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন? কেমন করে তিনি মানুষকে ডাকলেন—“এসো, আমরা সবাই মিলে এক আল্লাহর বান্দা হয়ে যাই”?
সেই ডাকে সাড়া দিয়ে যারা এগিয়ে এলেন, তারা প্রথমে ছিলেন একেবারে অসহায়: দাস, দরিদ্র, নিপীড়িত মানুষ। কিন্তু এই গলিপথের দাওয়াত তাদের এমন এক শক্তিতে পরিণত করল, যা পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তিকে পরাজিত করল।
এ আলোকে যদি আমরা আজকের পৃথিবীর সঙ্গে তুলনা করি, তবে আশ্চর্য মিল খুঁজে পাই। আজও মানুষ বিভ্রান্ত; সত্য আর মিথ্যার সীমারেখা ধুসর হয়ে গেছে।
আধুনিকতার মোড়কে স্বার্থপরতা আর অন্যায় ছড়িয়ে পড়েছে। এমন সময়ে আমাদের দরকার সেই আদর্শ, যা মক্কার গলিপথে জন্ম নিয়েছিল। দরকার সেই শিক্ষা, যা শিখিয়েছিল—মানুষের মর্যাদা গোত্রে নয়, বংশে নয়, অর্থে নয়; বরং তাকওয়ায়, অর্থাৎ আল্লাহর ভয় আর সৎকর্মে।
মক্কার গলিপথের ইতিহাস তাই আমাদের শেখায়, পরিবর্তন শুরু হয় ছোট্ট পরিসরে—একজন মানুষের দৃঢ় সংকল্প থেকে, কয়েকজনের মিলিত প্রচেষ্টা থেকে। তারপর সেই পরিবর্তন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে পুরো সমাজে, ছুঁয়ে যায় মহাদেশের পর মহাদেশ।
তাই আজ যদি আমরা সত্যিই আলোর সমাজ গড়তে চাই, তবে আমাদেরকেও ফিরতে হবে সেই শিকড়ে, সেই গলিপথের দিকে। সেখানে রয়েছে ধৈর্যের পাঠ, ভালোবাসার পাঠ, ন্যায়ের পাঠ—যা আজও আমাদের জন্য অমূল্য। মক্কার গলিপথ থেকে যে মশাল জ্বলে উঠেছিল, তার আলো গ্রহণ করার মধ্যেই আমাদের নতুন দিনের সূচনা।
সেই গলিপথের ইতিহাস কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, এটি আজকের জন্যও এক আহ্বান। যখন সমাজ ভেঙে যাচ্ছে স্বার্থের দাপটে, যখন সত্যের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যাচ্ছে ক্ষমতার চাপে—তখন আমাদের মনে পড়তে হবে সেই মুহূর্তের কথা, যখতাঁর সাহস, ধৈর্য আর ঈমান আজও আমাদের জন্য পথনির্দেশ। যদি আমরা তাঁর আদর্শকে জীবনে ধারণ করি, তবে আমরাও অন্ধকার সমাজে আলো ছড়াতে পারি। মক্কার সেই গলিপথ এভাবেই আমাদের হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে নতুন স্বপ্ন ও নবতর প্রেরণা।ন একা একজন মানুষ আলোর বার্তা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন অন্ধকারের মুখোমুখি।
"শান্তি ও নিরাপত্তা সংকট এবং সিরাতে তাইয়্যিবার আলোকে সমাধান" —ড. বশির আহমদ রিন্দ
রাসুল (সা.) এর জন্মতারিখ এর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ লেখক: মুফতি রেজাউল হক দা.বা. শায়খুল হাদিস ও মুফতি, জামিয়া দারুল উলুম যাকারিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা