বর্ষ: ১, সংখ্যা: ২
জুমাদাল আখিরাহ ১৪৪৭ | সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর- ২০২৫
আপোসকামিতা নয়; প্রয়োজন সুন্নাহর পূর্ণ অনুসরণ -শায়খ হাসান জামিল হাফি.
ষষ্ঠ হিজরির জিলকদ মাসে চোদ্দশ সাহাবিকে সাথে নিয়ে উমরার নিয়তে নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কার উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে জেদ্দাগামী মহাসড়ক থেকে বাইশ কিলোমিটার দুরত্বে অবস্থিত তৎকালীন হুদাইবিয়া নামক স্থানে যাত্রাবিরতি করেন। সেখান থেকে মক্কার কুরাইশদের কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য সায়্যিদুনা উসমান বিন আফফান রা. কে দূত হিসেবে পাঠানো হয়। কুরাইশরা উসমান রা. কে দেখে বিস্মিত। মক্কার ধনাঢ্য ব্যক্তিদের অন্যতম উসমান সাধারণ শ্রেনীর মানুষের মত ‘নিসফে সাক’ পর্যন্ত লুঙ্গি পরেছেন। শুভানুধ্যায়ী একজন এগিয়ে এসে পরামর্শ দিলেন, ‘আপনাকে অমন বিনীত দেখা যাচ্ছে কেন? লুঙ্গি টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে দিন। আরবে যার লুঙ্গি যত ঝোলানো থাকে তাকে তত মর্যাদাশীল মনে করা হয়। এভাবে কুরাইশদের সামনে গেলে তারা আপনাকে ন্যুনতম গুরুত্ব দেবে না।’ উপযাচকের পরামর্শ নাকচ করে দিয়ে দৃঢ় ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উসমান রা. উত্তর দিলেন:
لا، هَكَذَا إِزْرَةُ صَاحِبِنَا
কিছুতেই না। আমাদের নবির লুঙ্গি সর্বদা এভাবে থাকে। (মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবাহ, হা. - ৩৬৮৫২)
খ্যাতিমান সাহাবি সায়্যিদুনা হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান রা. সম্পর্কে প্রসিদ্ধ আছে, পারস্য সাম্রাজ্যের প্রধান সেনাপতি রুস্তমের দরবারে খাবার গ্রহণের সময় হঠাৎ একটি লোকমা হাত থেকে জমিনে পড়ে গেলে তিনি উঠিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করেন এবং খেতে উদ্যত হন। এমন মুহূর্তে জনৈক ব্যক্তি পাশ থেকে বলে ওঠে, এটা পারাস্য সেনাপতির দরবার। এখানে খাবারের অভাব নেই। জমিনে পড়ে যাওয়া খাবার তুলে খাওয়ার রীতি এখানে নেই। সাহাবি হুজাইফা রা. সাথে সাথে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান এবং দৃঢ়তাপূর্ণ কণ্ঠে কঠোর ভাষায় বলেন:
أَأَتْرُكُ سُنَّةَ حَبِيْبِيْ لِهؤُلاءِ الْحُمَقَاء
এসব নির্বোধদের জন্য কি আমি প্রিয় নবিজির সুন্নাহ ত্যাগ করবো?
নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ অনুসরণে সাহাবায়ে কেরাম ছিল পাহাড়সম অবিচল। পৃথিবীর তাবৎ সভ্যতা-সংস্কৃতি, আচার-বিচার ও পথ-পদ্ধতির বিপরীতে সুন্নতে নববিকে তারা মনে করতেন সফলতা ও মুক্তি, বিজয় ও নাজাতের একমাত্র উপায়। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা সুন্নতে রাসুলকে একমাত্র মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং অপরাপর সকল সুন্নাহ, মত ও তন্ত্র-মন্ত্রকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছিলেন। ফলে, শামের মাটিতে দাঁড়িয়ে আবু উবাইদাহ রা. যখন সায়্যিদুনা উমর ইবনুল খাত্তাবের সামনে প্রশ্ন তুললেন, হে আমিরুল মুমিনিন, এভাবে কাঁধে জুতা বহন করে এবং গোলামকে উটে বসিয়ে, নিজে উটের লাগাম ধরে প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করলে শহরের লোকেরা কি আপনাকে সম্মানের নজরে দেখবে? আমিরুল মুমিনিন উত্তর দিলেন:
إِنَّا كُنَّا أَذَلَّ قَوْمٍ فَأَعَزَّنَا اللَّهُ بِالْإِسْلَامِ فَمَهْمَا نَطْلُبُ الْعِزَّةَ بِغَيْرِ مَا أَعَزَّنَا اللَّهُ بِهِ أَذَلَّنَا اللَّهُ
আমরা সেই জাতি, নিঃসন্দেহে ইসলামের মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের সম্মান দিয়েছেন। অন্যকোনো মাধ্যমে যদি সম্মান ও মর্যাদা তালাশ করি, আল্লাহ তাআলা আমাদের অপদস্থ করবেন। (মুসতাদরাকে হাকেম, হা. -২০৭)
মুমিনজীবনে সফলতা লাভ করতে হলে তাই সুন্নতে রাসুলের পরিপূর্ণ অনুসরণ অনিবার্য। ব্যক্তিগত জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম; এমনকি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নবিয়ে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উসওয়া গ্রহণ করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অপরিহার্য। অন্য কোনো পথ ও মতের, অন্য কোনো সভ্যতা ও সংস্কৃতির, অন্য কোনো মতবাদ ও তন্ত্রের শরণ নিয়ে সফলতার আশা মুমিনের জন্য ইহলৌকিক ও পারলৌকিক পরাজয়ের নিয়ামক। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম চর্চাকারী দীনদার কিছু মানুষও আজকাল বিভিন্ন অনুষঙ্গে ও উপলক্ষে নবিজির সুন্নত ছেড়ে ভিনজাতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতি, বিশেষত পশ্চিমা সংস্কৃতির সাথে আপোস করে ফেলেন। ব্যবসায়িক উন্নতি, ক্ষমতার চেয়ার দখলসহ নিরেট দুনিয়াবি সম্মান ও কল্যাণ লাভের তাড়নায় সুন্নতকে ত্যাগ করে বসেন। কেউ কেউ তো অগ্রসর হয়ে ইসলামের অকাট্য বিধানসমূহকে অস্বীকার করার বা বিভ্রান্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা খাড়া করার রাস্তা বেছে নেন। এধরণের অনুচিত প্রবণতা তাদের ক্রমে ক্রমে ইসলামের সরল পথ থেকে বঞ্চিত করে এবং ভ্রষ্টতার চোরাবালিতে ঠেলে দেয়।
নবিজির জীবন আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। তাঁর কল্যাণময় সুন্নতসমূহের অনুসরণ আমাদের নাজাতের ওসিলা। জান্নাতি কাফেলার দলভুক্ত হয়ে প্রিয় হাবিবের হাতে কাউসার পানের উপায়। তাই প্রাত্যহিক জীবনে সুন্নতকে করতে হবে একমাত্র আদর্শ। বিস্তারিত জানতে হবে নবিজির পবিত্র জীবন, সুমহান চরিত্র। প্রাণের চেয়ে বেশী ভালবাসতে হবে নবিজিকে, নবিজির সুন্নতকে। দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে; যেভাবে তিনি বলেছেন। ত্যাগ করতে হবে সমস্ত আপোসকামিতা। কোথাও যদি সুন্নতের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় কেউ, যদি খাটো করে দেখাতে চায় প্রিয় হাবিবের জীবনাচারকে, সায়্যিদুনা আবু বকর সিদ্দিকের মত গর্জে উঠে বলতে হবে:
أَيَنْقُصُ الدِّيْنُ وَأَنَا حَيٌّ؟
"শান্তি ও নিরাপত্তা সংকট এবং সিরাতে তাইয়্যিবার আলোকে সমাধান" —ড. বশির আহমদ রিন্দ
রাসুল (সা.) এর জন্মতারিখ এর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ লেখক: মুফতি রেজাউল হক দা.বা. শায়খুল হাদিস ও মুফতি, জামিয়া দারুল উলুম যাকারিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা