বর্ষ: ১, সংখ্যা: ২
জুমাদাল আখিরাহ ১৪৪৭ | সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর- ২০২৫
নবী করিম ﷺ এর জীবন কণিকা মুফতি সুহাইব আহমদ কাসেমি অধ্যাপক ফিকহ, জামিয়া হুসাইনিয়া, জৈনপুর (উত্তরপ্রদেশ), ভারত
বিশ্বজগতের রাসূল, সৃষ্টির গৌরব, মুহাম্মদে আরবি ﷺ-কে আসমান ও জমিনের স্রষ্টা, মহান প্রভু, সমগ্র মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ নমুনা ও উত্তম আদর্শ হিসেবে প্রেরণ করেছেন। তাঁর ﷺ জীবনধারাকে আল্লাহ তাআলা প্রাকৃতিক ও ফিতরাত-সম্মত পথ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। মানবজাতির কল্যাণকামী এই মহান ব্যক্তিত্বের জীবনাচার কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য পরিচয় ও মানদণ্ড হয়ে থাকবে। একারণে সিরাতুন্নবি ﷺ-এর প্রতিটি দিক উজ্জ্বল, প্রতিটি কোণ আলোকোজ্জ্বল। তাঁর জন্মদিন থেকে ইন্তিকালের দিন পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহ তাআলা অগণিত মানুষের দ্বারা সংরক্ষিত করিয়েছেন। তাঁর ﷺ প্রতিটি আচরণ-উচ্চারণ সাহাবিরা সংরক্ষণ করেছেন এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রসহ আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তাই সিরাতুন্নবি ﷺ-এর পূর্ণতা ও পরিপূর্ণতা সব ধরনের সন্দেহ ও সংশয় থেকে মুক্ত। মানবজগতে যত মহামানবই হোক না কেন— তাঁদের জীবনবৃত্তান্ত, জীবনাচার, আচার-ব্যবহার, স্বভাব ও প্রবণতা, চলাফেরা, বসা-উঠা এবং অভ্যাস ও চিন্তাধারা— কোনো ক্ষেত্রেই রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সীরাতের মতো এত পূর্ণাঙ্গ ও দলিল-প্রমাণসহ সংরক্ষিত নয়। বরং তাঁর সাথে সম্পর্কিত ব্যক্তিবর্গ এবং তাঁর ﷺ সম্পর্কিত জিনিসপত্রের বিস্তারিত বিবরণও সিরাত ও ইতিহাসে প্রত্যেকের জন্য প্রমাণসহ পাওয়া যাবে।
কারণ এই নশ্বর দুনিয়ায় একটি উত্তম ও পূর্ণাঙ্গ জীবন যাপনের জন্য আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত ইসলামকে জীবনব্যবস্থা এবং আল্লাহর রাসূল ﷺ-কে জীবনাদর্শ বানিয়েছেন। আর তা হবে সেই পদ্ধতি যা সরাসরি নবী করিম ﷺ থেকে কথায় এবং কাজে প্রমাণিত হয়েছে।” তাঁর ﷺ এই পথই ‘সুন্নত’ নামে পরিচিত। আর তিনি ﷺ ইরশাদ করেছেন— ‘যে ব্যক্তি আমার সুন্নত থেকে বিমুখ হবে, সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়’।
ইবাদত ও আনুগত্য সম্পর্কিত তাঁর পবিত্র সিরাত ও পবিত্র অভ্যাসসমূহ নিয়ে যুগে যুগে অবিরত লেখা হচ্ছে ও বলা হচ্ছে। দুনিয়ার কোথাও না কোথাও, প্রতিটি মুহূর্তে, তাঁর ﷺ স্মরণ অবশ্যই হবে; তাঁর সিরাত বর্ণিত হতে থাকবে। তবুও সিরাতুন্নবি ﷺ-এর শিরোনাম কখনো পুরনো হবে না— এটাই সিরাতুন্নবি ﷺ-এর মুজিজা, আর এটাই “وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ” (“আমি তোমার জন্য তোমার স্মরণকে উচ্চ করেছি”) (সূরা আল-ইনশিরাহ : ৪) আয়াতের জীবন্ত ব্যাখ্যা।
দুনিয়া ও আখেরাতে সাহাবিয়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম আজমাঈনের সফলতা ও মর্যাদার মূল শিরোনাম হলো সুন্নতের অনুসরণ। আর এটাই প্রত্যেক যুগে, প্রত্যেক সময়ে মর্যাদা ও সৌভাগ্যের একমাত্র চাবিকাঠি। যদি কারও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগ প্রাপ্তির সুযোগ না হয়, তবে তাদের জন্য সাহাবিদের যুগ আদর্শ ও অনুসরণীয়— কেননা সাহাবিয়ে কেরামের পবিত্র জামাত সিরাতুন্নবির বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
সাহাবিদেরকে মানবজাতির প্রতিটি শ্রেণীর জন্য ইমান ও আমলের মাপকাঠি বানানো হয়েছে সবদিক যাচাই-বাছাই করার পর। তাদের আত্মশুদ্ধি ও দীক্ষা প্রদান করেছেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ। আর আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাদের আমল ও চরিত্র, আখলাক ও আচরণ, ইমান ও ইসলাম, তাওহিদ ও আকিদা, নেকি ও তাকওয়া— বারবার পরীক্ষা করেছেন, এরপর নিজের সন্তুষ্টি ও পছন্দ দ্বারা তাদের সম্মানিত করেছেন।
কখনো বলেছেন: “أُولَٰئِكَ الَّذِينَ امْتَحَنَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ لِلتَّقْوَىٰ” (সূরা আল-হুজুরাত (৪৯), আয়াত ৩)
এরা সেইসব ব্যক্তি, যাদের অন্তরের তাকওয়া আল্লাহ পরীক্ষা করেছেন।
কখনো বলেছেন: “آمِنُوا كَمَا آمَنَ النَّاسُ” (সূরা আল-বাকারা (২), আয়াত ১৩)
হে মানুষ, যেমন ইমান এনেছে মুহাম্মাদের সাহাবিরা, তোমরাও তেমন ইমান আনো ।
আবার কখনো বলেছেন: “أُولَٰئِكَ هُمُ الرَّاشِدُونَ” তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত। (সূরা হুজুরাত (৪৯), আয়াত ৭)
এ সবই এজন্য যে সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন সিরাতুন্নবি ﷺ-এর এক সুন্দর প্রতিচ্ছবি। শুধু তাদের ইবাদাত-বন্দেগীতেই নয়; বরং তাদের চলাফেরাতেও সিরাতুন্নবির ﷺ নূর ঝলমল করত। স্বয়ং রাসূলে কায়েনাত ﷺ ইরশাদ করেছেন—
“أصحابي كالنجوم بأيهم اقتديتم اهتديتم”
“আমার সাহাবিরা তারকার মত; তোমরা যে কারও অনুসরণ করবে, হিদায়াত পাবে।”
ইবনু হাযম, আল-ইহকাম ফি উসূলিল আহকাম (খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৮২), ইবনু হাজর, তাখরিজ আহাদীসুল কাশশাফ (খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪১৪), আস-সাখাভী, আল-মাকাসিদুল হাসানাহ (পৃষ্ঠা ১২৫), আল-আলবানী, আস-সিলসিলাতুদ-দঈফাহ (হাদীস নং ৫৮)
মরুভূমি বা জঙ্গলে ভ্রমণের সময় দিক নির্ণয়ে যেমনিভাবে তারকার সাহায্য নেওয়া হয়, তেমনি সাহাবিয়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমকে তারকার সাথে তুলনা করা হয়েছে— কেননা এই পবিত্র আত্মাগণ ছিলেন শিরক ও কুফরের মরুভূমিতে ঈমানের বাতিঘর।
উপস্থাপিত এই প্রবন্ধে সিরাতুন্নবি ﷺ-এর কয়েকটি বিশেষ দিক আলোচনার চেষ্টা করা হয়েছে, যা তাঁর কাছে দীক্ষাপ্রাপ্ত সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম বর্ণনা করে গেছেন। সংক্ষেপে সেসব দিক উল্লেখের চেষ্টা করা হয়েছে, সাধারণত যেসব কম আলোচিত হয়।
পবিত্র জন্ম ও রূপবর্ণনা
৯ বা ১২ রবিউল আউয়াল, ‘আমুল ফিল’ (হাতির বছর)-এ তিনি ﷺ মাতৃগর্ভ থেকে জন্ম গ্রহণ করেন।
শামায়িলুত তিরমিজি— ইমাম তিরমিজি রহিমাহুল্লাহ রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ— তাঁর ﷺ পবিত্র রূপবর্ণনার সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও পূর্ণাঙ্গ দলিল।
তিনি ﷺ ছিলেন মধ্যম উচ্চতার, রক্তিম আভাযুক্ত উজ্জ্বল শুভ্র বর্ণের অধিকারী। তাঁর পবিত্র মাথায় ছিল হালকা কোঁকড়ানো, রেশমের মতো নরম, অত্যন্ত সুন্দর কালো চুল; যা কখনো কাঁধ পর্যন্ত, কখনো ঘাড় পর্যন্ত, আর কখনো কানের লতি পর্যন্ত লম্বা হতো। তাঁর উজ্জ্বল মুখমণ্ডল ছিল এতই মনোরম, যে পূর্ণিমার জোছনাভরা পূর্ণ চাঁদের মতো দীপ্তিময় লাগত।
তাঁর পবিত্র বক্ষ ছিল প্রশস্ত, মসৃণ ও সুগঠিত— না অতিরিক্ত রোগা, না মোটা; কোথাও কোনো দাগ বা দোষ ছিল না। দুই কাঁধের মাঝখানে পিঠে ‘মোহরে নবুয়ত’ ছিল, যা ছিল কবুতরের ডিমের সমান, লালচে উঁচু এবং অতুলনীয় সুন্দর। তাঁর কপাল ছিল প্রশস্ত, উঁচু ও উজ্জ্বল; ভ্রু ছিল ধনুকাকৃতির; কিন্তু মিলিত নয়। তাঁর মুখমণ্ডল ছিল প্রশস্ত, ঠোঁট ছিল রক্তিম, আর তিনি ﷺ যখন হাসতেন দন্তমণি মুক্তার মতো ঝলমল করত। দাঁতের মাঝে সামান্য ফাঁকা ছিল। কথা বলার সময় মুখ থেকে নূরের আভা ছড়িয়ে পড়ত।
তাঁর বুকে ছিল নাভি পর্যন্ত প্রলম্বিত সরু লোমরেখা; দেহের বাকিটা ছিল লোমশূন্য। সাহাবায়ে কেরামের সর্বসম্মত মত হলো— তাঁর মতো সুন্দর কাউকে আদৌ কোনো চোখ দেখে নি।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সভাকবি, সাহাবি হযরত হাসসান ইবনু সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রশস্তিমূলক এক কবিতায় তাঁর সৌন্দর্যের চিত্র এভাবে এঁকেছেন—
وَأَحْسَنُ مِنْكَ لَمْ تَرَ قَطُّ عَيْنِي
আপনার চেয়ে সুন্দর কিছু আমার চোখ কখনো দেখেনি।
وَأَجْمَلُ مِنْكَ لَمْ تَلِدِ النِّسَاءُ
আপনার চেয়ে সুন্দর কাউকে জন্ম দেয়নি কোনো নারী।
خُلِقْتَ مُبَرَّأً مِنْ كُلِّ عَيْبٍ
আপনি সৃষ্টি হয়েছেন সকল ত্রুটি থেকে মুক্ত হয়ে।
كَأَنَّكَ قَدْ خُلِقْتَ كَمَا تَشَاءُ
যেন যেভাবে চেয়েছেন, সেভাবেই গড়া হয়েছে আপনাকে।
কখনো চিৎকার করে কথা বলতেন না তিনি। কখনো উচ্চ আওয়াজে হাসতেন না। হৈচৈ করতেন না। উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে কথা বলতেন না। প্রতিটি শব্দ পরিষ্কার উচ্চারণ করতেন। জনসম্মুখে কথা বলার সময় প্রতিটি বাক্য তিনবার স্পষ্টভাবে পুনরাবৃত্তি করতেন। তাঁর কথা বলার ভঙ্গি ছিল মর্যাদাপূর্ণ, শব্দসমূহে ছিল মাধুর্য—যা শোনার জন্য মন সদা আকুল থাকত। ঠোঁটে সদা লেগে থাকত মুচকি হাসি, যা তাঁর ঠোঁট ও মুখমণ্ডলের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিত দ্বিগুণ।
রাস্তা দিয়ে এমনভাবে চলতেন, যেন কোনো উঁচু স্থান থেকে অবতরণ করছেন। ডানে-বামে তাকাতেন না। আকাশের দিকে মাথা তুলে হাঁটতেন না। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল বিনয়, মর্যাদা ও দৃঢ়তা। তিনি পদদ্বয় পূর্ণভাবে মাটিতে রাখতেন, তাতে জুতার শব্দ শোনা যেত না। তাঁর হাত ও পা ছিল রেশমের মতো কোমল। পা ছিল মাংসল। ব্যক্তিগত ব্যাপারে কখনো রাগ করতেন না। নিজের কাজ নিজে করতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না। কেউ তাঁর সঙ্গে করমর্দন করলে, সেই ব্যক্তি হাত ছাড়ার আগ পর্যন্ত তিনি সরিয়ে নিতেন না। যার সঙ্গে কথা বলতেন, তার দিকে পুরো মনোযোগ দিয়ে তাকাতেন। কেউ তাঁকে কিছু বললে মনোযোগ সহকারে শুনতেন। তবুও তাঁর এমন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিল যে, সাহাবায়ে কেরাম সহজে তাঁর সঙ্গে কথা বলার সাহস পেতেন না। প্রত্যেকেই মনে করতেন— তিনি যেন তাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন।
দাওয়াত ও তাবলিগের সূচনা
রিসালাতের তাজ ও নবুওয়াতের অভিসার দ্বারা সম্মানিত হওয়ার পর রহমাতুল্লিল আলামিন, খাতামুন নাবিয়্যিন ﷺ এমন এক সমাজকে ইমান ও তাওহীদের দিকে আহ্বান করলেন, যারা শিরক ও কুফরের কাদায় ডুবে ছিল আকণ্ঠ। বিভ্রান্তি ও অজ্ঞতার শিকার ছিল মানবতা। শালীনতা ছিল লুপ্ত। বর্বরতা ও পশুত্বের ছিল আধিপত্য। প্রতিটি শক্তিশালী ব্যক্তি যেন একেকজন ফেরাউনের রূপ ধারণ করেছিল। মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছিল হত্যা, খুন, রাহজানি। না ছিল সম্মানের হিফাজত, না ছিল ইজ্জতের নিরাপত্তা। নারীদের কোনো মর্যাদা ছিল না। গরিবদের জন্য কোনো আশ্রয় ছিল না। পানির মতো পান করা হতো মদ। বেহায়াপনা ছিল চরম পর্যায়ে। পৃথিবীর বুকে তাওহিদের কোনো অস্তিত্ব অবশিষ্ট ছিল না। স্বার্থপরতা ও লোভ-লালসার রাজত্ব চলছিল। চুরি, ব্যভিচার ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ে। আর জুলুম-অত্যাচার ও অবিচার ছিল শিখরে।
এক আল্লাহর ইবাদতের জায়গায় মিথ্যা দেব-দেবীর সামনে কপাল নত করা হতো। হিংসা ও বিদ্বেষের বিষাক্ত বাতাস মানুষকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। মানবতা যেন শেষ নিঃশ্বাস নিচ্ছিল। সমাজ থেকে শিরকের দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল, কুফরের নাপাকিতে অন্তরগুলো দুর্গন্ধময় হয়ে গিয়েছিল। সেই যুগের মানুষ কুরআনুল কারীমের ভাষায় জাহান্নামের কিনারায় দাঁড়িয়ে ছিল—ধ্বংসের মুখে পতিত হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে। তখন রহমতের মালিক আল্লাহ তা‘আলার রহম উদিত হলো এবং বহু শতাব্দী পর সাফা পাহাড় থেকে মানবতা রক্ষার ঘোষণা শোনা গেল—
“يَا أَيُّهَا النَّاسُ قُولُوا لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ تُفْلِحُوا”
“হে মানুষ! লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ-তে ইমান আনো, মুক্তি ও কল্যাণ লাভ করবে।”
• সিরাত ইবনে هشام, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা - ২৬২)
• আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া – (খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা - ৩৯)
• আল-মু‘জামুল কাবীর – (হাদীস নং - ১৪২৪৪)
• শরহুস সুন্নাহ – (খণ্ড ১, পৃষ্ঠা - ৭৫)
এটি কেবল একটি আহ্বান ছিল না—ছিল বাতিলের প্রাসাদে বজ্রাঘাতের মতো এক প্রচণ্ড আঘাত।
এটি ছিল বজ্রধ্বনি, নাকি হেদায়েতের কণ্ঠস্বর যা আরবের মাটিকে কাঁপিয়ে দিলো চরমভাবে।
এ সেই সত্যের ডাক, যা এক মহত্তম বিপ্লবের সূচনা করেছিল; যা মানবতার ইতিহাস পাল্টে দিয়েছিল। এটি ছিল তাওহিদের ঘোষণা নতুন জীবনের বার্তা, যা মৃতপ্রায় আরবদের অন্তরে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছিল। আর তারপর দুনিয়া এমন দৃশ্য দেখল, যা কল্পনাতেও আসেনি— হত্যাকারীরা ন্যায়পরায়ণ হয়ে গেল, মূর্তিপূজারীরা মূর্তি-ভঞ্জক হয়ে গেল, জুলুমকারীরা সত্যনিষ্ঠ ও দয়ালু হয়ে গেল। যেসব কপাল শত শত মূর্তির সামনে নত হতো, সেগুলো একমাত্র আল্লাহর সামনে সেজদায় লুটিয়ে পড়ল। নারীদের পশুর থেকেও অধম গণ্য করা, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা এবং দুর্বলদের উপর নির্যাতন চালানো লোকেরা নারীর রক্ষক, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষাকারী ও দুর্বলদের সহায়ক হয়ে উঠল। বিদ্বেষ আর শত্রুতার আগ্নেয়গিরি নিভে গেল, ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের বসন্ত ফিরে এলো। পথরোধকারীরা পথপ্রদর্শক হয়ে গেল, আর অত্যাচারীরা হয়ে উঠল ন্যায় ও ইনসাফের বার্তাবাহক।
যারা নিজেরাই ছিল পথহারা, অন্যদের পথপ্রদর্শক হয়ে গেল,
কী দৃষ্টি ছিল তা, যা মৃতদের জীবন্ত চিকিৎসকে রূপান্তর করল!
তারপর দুনিয়া দেখল কিভাবে একজন নিরক্ষর অথচ উচ্চ বংশীয় রাসুল ﷺ–এর নিবেদিতপ্রাণ সাহাবিরা ইমান ও তাওহিদের ইতিহাস রচনা করলেন, ন্যায় ও ইনসাফের চিরন্তন দাগ রেখে গেলেন, ঐক্য ও সমতার অমর কাহিনী লিখলেন। তারা বিজয়ের এক অনন্য ইতিহাস রচনা করলেন, শাসন ও নেতৃত্বের জন্য আদর্শ নীতিমালা প্রণয়ন করলেন, পবিত্রতা ও সতীত্বের এক উজ্জ্বল রেকর্ড রেখে গেলেন, বিশ্বস্ততা ও আত্মত্যাগের এক অবিনশ্বর লিপি দিলেন। তারা মহত্ত্ব ও মর্যাদার এমন উচ্চতায় পৌঁছলেন— যেখান থেকে উপরে কেবল নবী ও রাসুলগণ পৌঁছাতে পারেন। এমন বিপ্লব দুনিয়া কখনো দেখেনি, কোথাও শোনেনি।
ধৈর্য ও স্থিরতা
রাসুলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর প্রতি আহ্বান ও তাওহিদের ঘোষণা প্রচারের পথে নিজের জাতির এমন দুর্দশা ও কষ্ট দেখেছেন, যা অন্য কেউ দেখলে হয়তো হাল ছেড়ে দিত। কিন্তু তিনি ছিলেন ধৈর্য ও স্থিরতার এক অটল পাহাড়। ইসলামবিরোধীরা প্রতি পদে তাঁকে হয়রানি করেছিল, মিথ্যা অভিযোগ আর ভ্রান্ত প্রলাপ দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল, তাঁকে পাগল বা উন্মাদ বলেছিল, জাদুকর বা তন্ত্রবিদের উপাধি দিয়েছিল। পথে কাঁটা বিছিয়েছে, পবিত্র শরীরে অপবিত্রতা ঢুকিয়েছে, প্রলোভন দেখিয়েছে, হুমকি দিয়েছে, আর্থিকভাবে অবরোধ করেছে ও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করেছে। তাঁর অনুসারীদের উপর অত্যাচার, জুলুম, এবং নিপীড়নের পাহাড় গড়ে তুলেছে। নতুন নতুন ভয়ানক কষ্টের দরজা খুলে দিয়ে চেষ্টা করেছে যে হয়তো সত্যের যাত্রা থেমে যাবে, সত্যের কণ্ঠ নীরব হয়ে যাবে।
কিন্তু বিপ্লবের সময় শুরু হয়ে গেছে—তাওহিদের স্লোগান ইতোমধ্যে উচ্চারিত হয়েছে এবং তা বিজয়ী হওয়ারই ছিল।
یریدون لیطفوٴا نور اللّٰہ بافواہہم واللّٰہ متم نورہ ولو کرہ الکافرون
তারা চায় আল্লাহর আলোকে তাদের মুখ দিয়ে (অপবাদ বা অন্ধকারিতার দিকে ঘুরিয়ে) বন্ধ করে দেবে, অথচ আল্লাহ তাঁর আলোকে পূর্ণ করবেন, যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে। (সূরা তওবা (৯), আয়াত ৩২)
রসূলুল্লাহ ﷺ নিজে বলেছেন: আমার উপর যতটা পরীক্ষা ও সংকট এসেছে ততটা অন্য কারো উপর আসেনি। ঠিক একইভাবে, তাঁর সাহাবিগণের উপর যত অত্যাচার করা হয়েছে, অন্য কোনো উম্মতের উপর তা করা হয়নি।
হিজরত-মুবারক
যখন মক্কার ভূমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং সাহাবিগণের জন্য একেবারে সংকীর্ণ হয়ে পড়েছিল, তখন আল্লাহর নির্দেশানুসারে তিনি মদিনার দিকে হিজরত করেন। সাহাবিগণ আল্লাহর জন্য তাদের ঘর-বাড়ি, পরিবার, সম্পত্তি সব কিছু ছেড়ে হিজরত করেন। প্রথম হিজরত সাহাবিদের একটি দল করেছিলেন হাবশায়। পরে যখন তিনি মদিনায় গমন করেন, মদিনা ইসলামের কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠে। হিজরত সম্পর্কে মুফাক্কিরে ইসলাম আলি মিয়া নদভী রহ. বলেন, এটি যে কতটা গভীর আত্মত্যাগের নিদর্শন, তা বোঝায় যে সাহাবিগণ কত অসাধারণ ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন।
“রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হিজরতের মাধ্যমে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো দাওয়াত (ইসলামের দাওয়াত) এবং আকিদা (বিশ্বাস) এর জন্য মানুষ তার সকল প্রিয় ও প্রিয়তম বস্তু, যা তার কাছে প্রিয় বা যেটির প্রতি তার আবেগ প্রবল, তা নিঃস্বার্থভাবে ত্যাগ করতে পারে। তবে এই দুটি — দাওয়াত ও আকিদা — কোনো অবস্থাতেই ত্যাগ করতে প্রস্তুত হয় না। (নবি করিম ﷺ) এবং হিজরত রসূল ﷺ-এর এই শিক্ষা আজও মুসলমানদের জন্য স্পষ্ট বার্তা বহন করে যে, ইমান ও বিশ্বাস এবং দাওয়াত ও তাবলিগ কখনোও ত্যাগ করা উচিত নয়। কারণ এই দুটি হচ্ছে সমস্ত দুনিয়া ও আখিরাতের সম্মান ও সফলতার মূল উৎস।”
“গাজওয়াত ও সরায়া (যুদ্ধ ও অভিযানের ঘটনা)
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হিজরতের পর একদিকে ইসলাম প্রচারের জন্য প্রশস্ত ময়দান এবং সৎ ও নিবেদিত সহকর্মী মিলে যায়, যার ফলে আরবের বিভিন্ন গোত্রে ইসলাম দ্রুত ছড়াতে শুরু করে। অন্যদিকে, মক্কা ও ইয়েমেনের মুশরিকরা যুদ্ধের আয়োজন করতে থাকে। মক্কায় মুসলমানরা তখন দুর্বল ও ক্ষমতাহীন; আপন ধৈর্য্য ও দৃঢ়তা বজায় রাখার জন্য বারবার তাদের শিক্ষা ও উপদেশ দেওয়া হতো।
মদিনায় মুসলমানরা শক্তিশালী ও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন এবং সেখানে শাসনকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। শত্রুদের সঙ্গে লড়াই করার এবং তাদেরকে প্রতিহত করার জন্য আল্লাহ তাআলা তাদেরকে অনুমতি দান করেন। সেই সময় থেকে গাজওয়া ও সারিয়া (যুদ্ধ ও অভিযানের) ধারাবাহিকতা শুরু হয়। গুরুত্বপূর্ণ কিছু গাজওয়াতের সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নে দেওয়া হলো।”
১) গাজওয়াহ বদর (২ হিজরি)
বদরের ময়দানে মুমিন ও মক্কার মুশরিকদের মধ্যে প্রথম গাজওয়া সংঘটিত হয়। রসূলুল্লাহ ﷺ-এর নেতৃত্বে ৩১৩ জন যোদ্ধা মুশরিকদের ১,০০০ সৈন্যের শক্তিশালী বাহিনীকে পরাজিত করেন। এই যুদ্ধে আবু জাহেল, শাইবা, উতবা সহ ৭০ জন কুরাইশের শীর্ষ নেতা নিহত হন এবং ৭০ জন বন্দী হন। এই বিজয় মুসলমানদের নাম আরবের বিভিন্ন গোত্র-উপগোত্রে ছড়িয়ে দেয়।
২) গাজওয়াহ উহুদ (৩ হিজরি, শওয়াল)
এই যুদ্ধে মুসলমান ছিলেন ৭০০ এবং কাফেররা ছিল ৩,০০০।
৩) গাজওয়াহ জাতুর-রিকা (৪ হিজরি)
এই যুদ্ধে রসূলুল্লাহ ﷺ “সালাতুল খাওফ” (যুদ্ধকালীন নামাজ) আদায় করেন।
৪) গাজওয়াহ আহযাব (খন্দক, ৫ হিজরি)
মক্কার মুশরিকরা আরবের বিভিন্ন গোত্রের একত্রিত বাহিনী গঠন করে আক্রমণ করে। রসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবী সালমান ফারসীর পরামর্শে মদিনার চারপাশে ৬ কি,মি, দীর্ঘ খন্দক করেন। তাই এই যুদ্ধে “গাজওয়াহ খন্দক” নামেও পরিচিত।
৫) গাজওয়াহ বনি-মুস্তলিক (৬ হিজরি)
এই যুদ্ধে মুনাফিকগণ সাহাবী হযরত আয়েশা رضی اللہ عنہا-এর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনেন।
৬) সুলহে হুদাইবিয়াহ (৬ হিজরি)
রসূলুল্লাহ ﷺ উমরাহর আকাঙ্ক্ষায় ১,৪০০ সাহাবীর বিশাল দল নিয়ে রওনা হন। কিন্তু মক্কার মুশরিকরদের বাধার মুখে পড়ে হুদাইবিয়াতে শিবির স্থাপন করতে হয়। সেখানেই চুক্তি সম্পন্ন হয় এবং সিদ্ধান্ত হয় পরবর্তী বছর উমরাহ করতে বাধা দেওয়া হবে না । (বিস্তারিত বিবরণ ইসলামী বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায়)
৭) গাজওয়াহ খাইবার (৭ হিজরি)
দের সঙ্গে এটা চূড়ান্ত যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এর পূর্বে বনি নাজীর এবং বনি কুরাইজার সাথে যুদ্ধে ইহুদিদের নির্বাসিত ও হত্যা করা হয়।
৮) গাজওয়াহ তাবুক (৯ হিজরি)
এই অভিযান ছিল হিরাক্লিয়াসের সঙ্গে মোকাবেলার জন্য। এটি ছিল দীর্ঘ যাত্রা, দুরূহ পরিভ্রমণ। অভিযান সংঘটিত হয় গরমের সময়। রাসূলুল্লাহ ﷺ এ অভিযানে যুদ্ধসরঞ্জাম ও অর্থ সংগ্রহের ঘোষণা করেন এবং সাহাবীগণ মন খুলে অংশগ্রহণ করেন। ৩০,০০০ সৈন্য নিয়ে নবিয়ে আকরাম সা. তাবুকের উদ্দেশে রওনা হন। হিরাক্লিয়াস পালিয়ে যায়। রসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবির সঙ্গে নিরাপদে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন। এই অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনা সংঘটিত হয়, যা বিস্তারিত ইসলামী ইতিহাস গ্রন্থে পাওয়া যায়।
এই সব গাজওয়াহ ছাড়াও বিভিন্ন সময় সাহাবী নেতৃত্বে ছোট অভিযান বা সারিয়া পরিচালিত হয়।
রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে দূত পাঠানো
তিনি আরব-অনারব সকল ধরনের শাসক ও রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে ইসলাম ও তাওহিদের প্রতি আহ্বানসহ চিঠি প্রেরণ করেন। যেসব সাহাবিকে দূত হিসেবে পাঠানো হয়েছিলো: তাঁদের নামসমূহ
আমর ইবনে উমাইয়াرضی اللہ عنہ কে হাবশার বাদশা (নাজাশি) এর কাছে
দিহইয়া আল কালবি رضی اللہ عنہ – কে রোমের বাদশা হিরাক্লিয়াসের কাছে
আব্দুল্লাহ বিন হুজাইফা رضی اللہ عنہ –কে পারস্যের কিসরার কাছে
হাতিব বিন আবি বালতায়া رضی اللہ عنہ – কে ইস্কান্দার এর বাদশা (মুক্কুস) এর কাছে
আমর ইবনুল আস رضی اللہ عنہ – কে ওমানের বাদশার কাছে
সুলাইত বিন উমর رضی اللہ عنہ – কে ইয়ামামার রঈস হুদা বিন আলীর কাছে
শুজা বিন ওহব رضی اللہ عنہ কে –বলকা’র বাদশার কাছে
মুহাজের বিন উমাইয়া رضی اللہ عنہ কে হিমরি এর রক্ষক বাদশা হামিরের কাছে
আলা বিন হাজরামি رضی اللہ عنہ কে –বাহরাইনের শাসক মুনজির বিন সাভি’র কাছে
আবু মুসা আশাআরী ও মুআয বিন জাবেল رضی اللہ عنهما কে – আহলে ইয়েমেনের কাছে
কাতিবীন (ওহী লিখনকারীরা)
রাসূলুল্লাহ ﷺ উম্মি ছিলেন (পড়া-লিখা জানতেন না), তাই ওহী যখন তাঁর পবিত্র হৃদয়ে নাযিল হতো, তখন বিভিন্ন সাহাবিকে তা লেখাতেন।
কাতিবীন
আবুবকর সিদ্দীক, উমর বিন খাত্তাব, উসমান বিন আফফান, আলী বিন আবি তালেব, আমের বিন ফুহায়রা, আব্দুল্লাহ বিন আরকাম, উবাই বিন কাব, সাৱিত বিন কাইস বিন শাম্মাস, খালিদ বিন সাঈদ, হানযালাহ বিন রাবি, জায়েদ বিন সাঈদ, মুয়াবিয়া বিন আবি সুফিয়ান, সুরাহবিল বিন খুসনা(رضی اللہ عنہم)।
যাঁদের প্রতি বিশেষ অনুকম্পা ছিল
রাসূলুল্লাহ ﷺ হযরত যায়েদ ইবনে হারিসা ও তাঁর পুত্র হযরত উসামা ইবনে যায়েদ رضي الله عنهما-কে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। হযরত যায়েদ ইবনে হারিসা যখনই কোনো সফর থেকে ফিরে আসতেন, নবী করিম ﷺ আবেগাপ্লুত হয়ে তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরতেন। আর হযরত উসামা ইবনে যায়েদের কোনো কথা তিনি প্রত্যাখ্যান করতেন না। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন তাঁকে হুব্বে রাসুল বলা হতো। সাহাবিয়ে কেরাম رضوان الله عليهم أجمعين তাঁর মাধ্যমে সুপারিশ করতেন।
হযরত সালমান ফারসি رضي الله عنه কে রাসুল ﷺ বিশেষভাবে ভালোবাসতেন। তিনি তাঁদের সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন: “সালমান আমাদের আহলুল বাইতের অন্তর্ভুক্ত।”
একইভাবে হযরত বিলাল, হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির, হযরত আবু জর গিফারি এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ رضي الله عنهم ও রাসুল ﷺ-এর প্রিয় ও বিশেষ অনুরাগভাজন সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
আত্নীয় ও বিবাহিত জীবন
মৃত্যুর সময় তাঁর নয়জন (৯) স্ত্রী ছিলেন। এদের বৈশিষ্ট্য কোরআনের সূরা আহযাবে উল্লেখ আছে:
“یا نساء النبی لستن کأحد من النساء”
বিশেষভাবে হযরত খদিজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহা, হযরত আয়েশা, হযরত হাফসা, হযরত উম্মে সালামা, হযরত জয়নব বিনত জাহাশ, হযরত উম্মে হাবিবা, হযরত জুওয়াইরিয়া বিনতে হারিস, হযরত মাইমুনা বিনতে হারিস, হযরত ফাতিমা বিনতে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – নবীজীর প্রিয়তম কন্যা।
সন্তানরা
সমস্ত সন্তান হযরত খদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে, শুধুমাত্র হযরত ইব্রাহিম (মারিয়া কিবতিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে) ব্যতীত।
কন্যা: হযরত জয়নব, হযরত রুকাইয়া, হযরত উম কুলছুম, হযরত ফাতিমা।
হযরত ফাতিমা – ছোটতম এবং প্রিয়তম কন্যা, হযরত আলীর সঙ্গে বিবাহিত।
হযরত হাসান ও হযরত হুসাইন – হযরত ফাতিমা থেকে।
পুত্র: হযরত আব্দুল্লাহ (তাহির), হযরত কাসিম (হযরত খদিজা থেকে), হযরত ইব্রাহিম (মারিয়া কিবতিয়া থেকে)।
সীরাতের শিক্ষা
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন (সিরাত) দেখায় যে, কিভাবে একজন মুসলিম পূর্ণমানব ও আদর্শ পিতা, স্বামী, শ্বশুর, জামাতা, ব্যবসায়ী, সৈনিক, নেতা, পরিশ্রমী, দারিদ্র্য সহনশীল হতে পারে।
তিনি মানুষ হিসেবে সবধরনের মানবিক কাজ করেছেন – ব্যবসা, লেনদেন, ঋণ, পশুপালন, যুদ্ধ, শিক্ষা, খিদমত
– তাই তাঁকে আদর্শ হিসেবে না মানলে মানুষ প্রকৃতভাবে সফল পিতা, স্বামী বা মুসলিম হতে পারে না।
সিরাত অধ্যয়ন করা অপরিহার্য, কারণ এটি মানব জীবনের প্রতিটি দিকের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশ দেয়।
ভাষান্তর
মাওলানা মুবাশ্বির হাসান
"শান্তি ও নিরাপত্তা সংকট এবং সিরাতে তাইয়্যিবার আলোকে সমাধান" —ড. বশির আহমদ রিন্দ
রাসুল (সা.) এর জন্মতারিখ এর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ লেখক: মুফতি রেজাউল হক দা.বা. শায়খুল হাদিস ও মুফতি, জামিয়া দারুল উলুম যাকারিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা