বর্ষ: ১, সংখ্যা: ১
রজব, শাবান, রমজান - ১৪৪৭ | ডিসেম্বর - ২০২৫, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি - ২০২৬
সহিহ হাদিস ও আসারের আলোকে ইসরা ও মেরাজ মুফতি আবদুল কাইয়ুম
মানব-ইতিহাসের মহিমান্বিত ঘটনাবলির মধ্যে ইসরা ও মিরাজ এক এমন বিস্ময়,যা মানববোধের সীমানা অতিক্রম করে আল্লাহর কুদরতের অশেষ প্রমাণ বহন করে। এই রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবিব হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে জেরুজালেমের মসজিদুল আকসা পর্যন্ত বিশেষ সফরে নিয়ে যান এবং সেখান থেকে সাত আসমান অতিক্রম করে সিদরাতুল মুনতাহা ও আরশের নিকটবর্তী অঞ্চলে পৌঁছে দেন। এই মহাযাত্রায় নবিজিকে দেখানো হয় আসমানি নিদর্শন। লাভ করেন নবিদের সাক্ষাৎ। প্রত্যক্ষ করেন জান্নাত- জাহান্নাম। প্রদান করা হয় মানবজাতির জন্য শ্বাশত উপহার-পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম সহ হাদিসের কিতাবসমূহ ও আলেমদের বর্ণনায় সেসব ঘটনা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত।
কুরআনুল কারিমে ইসরার প্রমাণ:
ইসরা ও মিরাজের প্রথম ধাপ ইসরা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন:
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا ۚ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
পবিত্র সেই সত্তা যিনি তাঁর বান্দাকে রাত্রিবেলা ভ্রমণ করালেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত; যার চারপাশকে আমি কল্যাণময় করেছি; যাতে আমি তাঁকে আমার নিদর্শনসমূহ দেখাতে পারি। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। (সূরা আল-ইসরা, আয়াত ১)
মুফাসসিরিনে কেরামের মতে কোরআনে سبحان শব্দ দিয়ে সূচনা করার কারণ হলো, পরবর্তী যেসব ঘটনা বর্ণিত হবে তা সম্পূর্ণ আল্লাহর কুদরতের প্রমাণ।
أَسْرَىٰ শব্দটি জাগ্রত অবস্থায় রাত্রিকালীন ভ্রমণ বুঝায়; কোনভাবেই স্বপ্নে ভ্রমণ নয়।
عَبْدِهِ শব্দটিও শরীরসহ বান্দা অর্থেই ব্যবহৃত হয়।
ইসরা: অলৌকিক রাত্রী যাত্রার সূচনা (মক্কা থেকে মসজিদুল আকসা)
ইসরার ঘটনাবলি বিভিন্ন সহিহ হাদিসে বিস্তারিত এসেছে।
عن أنس بن مالك قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ا: أُتِيتُ ليلةَ أُسرِيَ بي ، فانطُلِقَ بي ، إلى زمزمَ فشرح عن صدري ، ثم غُسِلَ بماء زمزمَ ، ثم أنزل
হযরত আনাস ইবনে মালেক রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল সা. বলেছেন, আমার নিকট ফেরেশতা এলেন এবং তারা আমাকে নিয়ে জমজমের কাছে গেলেন। সেখানে আমার বক্ষ বিদীর্ণ করা হলো। তারপর জমজমের পানি দিয়ে আমার বক্ষ ধৌত করা হলো। এরপর নির্ধারিত স্থানে আমাকে নামিয়ে দেওয়া হল। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬২)
বক্ষ বিদারণের হেকমত:
হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম বক্ষ বিদারণ করে কলব বের করে জমজম পানি দ্বারা ধৌত করেছেন, এবং হেকমত ও ঈমান দ্বারা পরিপূর্ণ স্বর্ণের একটি তশতরি এনেছেন। এই হেকমত ও ঈমান ঢেলে দিয়েছেন কলব মোবারকে। বক্ষ বিদারণ আগেও হয়েছে; কিন্তু তখন ছিল ভিন্ন কারণে। এবারের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। এবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উর্ধ্ব জগতে ভ্রমণ করবেন। সেখানে অনেক অসাধারণ জিনিস দেখবেন। সেজন্য আত্মিক শক্তি সৃষ্টি করতে এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইতিপূর্বে হযরত জিব্রাইল আলাইহিস সালাম একবার স্বরূপে দিগন্তে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। তা দেখে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গিয়েছিলেন। জিব্রাইল অপেক্ষা বিশাল দেহী ফেরেশতা হলেন হযরত মিকাইল আলাইহিস সালাম। যার সামনে হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালামকে একটি ছোট পাখির ন্যায় দেখা যায়। হযরত মিকাইল আলাইহিস সালামের চেয়েও বড় ও বিশাল দেশী ফেরেশতা রয়েছেন। মোটকথা, প্রচুর বিস্ময়কর জিনিস দেখার যোগ্যতা তৈরী ও মানসিক প্রস্তুতির জন্য এ বক্ষ বিদারণ এবং ঈমান ও হিকমত দ্বারা পরিপূর্ণ করার ঘটনা ঘটেছে।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইসরা:
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার মসজিদুল হারামে ছিলেন, তখন জিবরাইল আ. আগমণ করেন এবং নবিজিকে নিয়ে সামনে অগ্রসর হন। তাঁকে আরোহন করানো হয় বোরাক নামক বিশেষ বাহনে; যা গাধার চেয়ে ছোট, খচ্চরের চেয়ে বড় এবং তার গতি ছিল এমন দ্রুত যে, তার প্রতিটি পদক্ষেপ দৃষ্টির সীমান্তে গিয়ে পড়তো।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বোরাকে চড়ে অল্প সময়ে পৌঁছে যান মসজিদুল আকসায়। সেখানে আগে থেকে উপস্থিত ছিলেন আদম, নূহ, ইব্রাহিম, মুসা ও ঈসা আলাইহিমুস সালাম সহ সকল নবি ও রাসুল।
বাইতুল মুকাদ্দাসে নামাজ আদায়:
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :
ثُمَّ دَخَلْتُ الْمَسْجِدَ فَصَلَّيْتُ فِيهِ رَكْعَتَيْنِ
অর্থাৎ, আমি মসজিদে প্রবেশ করলাম এবং সেখানে দুই রাকাত নামাজ আদায় করলাম। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬২)
উল্লেখিত হাদিসের বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, বাইতুল মুকাদ্দাসে পৌঁছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। শুধু বাইতুল মুকাদ্দাসে নয়; সেখানে পৌঁছানোর পূর্বে আরো কয়েক জায়গায় তিনি নামাজ আদায় করেন। সুনানে নাসায়ির এক বর্ণনায় আছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: আমি বোরাকে আরোহী ছিলাম। আমার সঙ্গে ছিলেন হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম। এক জায়গায় পৌঁছার পর তিনি বললেন, আপনি কি জানেন, এটা কোন জায়গা? আপনি পবিত্র ভূমিতে নামাজ আদায় করেছেন এবং এটিই হচ্ছে আপনার হিজরতের স্থান। মুসনাদে বাযযারে আছে, রাসুলুল্লাহ সিনাই পাহাড়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। যেখানে হযরত মুসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথন করেছিলেন। এখানে নামাজ আদায় করার পর জিবরাঈল আলাইহিস সালাম বলেন, আপনি بيت اللحم বা بيت الحمد এ দুই রাকাত নামাজ আদায় করুন; যেখানে ঈসা আলাইহিস সালাম জন্মগ্রহণ করেছেন। যাত্রাপথে তিনি মাদায়েনেও নামাজ আদায় করেছিলেন।
মেরাজ: বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে সাত আসমান পর্যন্ত অলৌকিক নুরানি সফর
বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে মেরাজ যাত্রার মূল অধ্যায় শুরু হয়। জিব্রাইল আলাইহিস সালাম স্বর্গীয় সিঁড়ি, যাকে মেরাজ বলা হয়, এর মাধ্যমে তাঁকে আকাশের দিকে নিয়ে যান।
ثم عُرِجَ بنا إلى السماءِ ، فاستفتح جبريلُ ، فقيل : من أنت ؟ قال : جبريلُ ، قيل : ومَن معك ؟ قال : محمدٌ ، قيل : وقد بُعِثَ إليه ؟ قال : قد بُعِثَ إليه ، ففُتِح لنا ، فإذا أنا بآدمَ
হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম আমাকে নিয়ে উর্ধ্বলোকে গেলেন এবং আসমান পর্যন্ত পৌঁছে দরজা খুলতে বললেন। বলা হলো, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি জিব্রাইল। বলা হলো, আপনার সাথে কে? বললেন, মুহাম্মদ। জানতে চাওয়া হলো, তাকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছ? বললেন হ্যাঁ, ডেকে পাঠানো হয়েছে। অতঃপর আমাদের জন্য দরজা খুলে দেওয়া হল। সেখানে আমি হযরত আদম আলাইহিস সালাম এর সাক্ষাৎ পাই। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬২)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তিনি আমাকে স্বাগত জানালেন, দোয়া করলেন এবং বললেন
مرحبا بالنبي الصالحِ ، والابنِ الصالحِ
স্বাগতম, হে নেক সন্তান ও হে নেক নবি!
এটি ছিল নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বপ্রথম আসমানি সম্মান। জিবরাঈল আলাইহিস সালামের দরজায় অনুমতি প্রার্থনা করলে দরজা খোলা হয়। সেখানে ছিলেন হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম এবং হযরত ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম। দুজনেই নবিজি সাল্লাল্লাহু সালাম কে দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং বলেন:
مرحبا بالنبي الصالحِ والأخِ الصالحِ
হে নেক ভাই! হে নেক নবি! আপনাকে স্বাগতম।
তৃতীয় আসমানে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইউসুফ আলাইহিস সালাম এর সাক্ষাৎ পেলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
وإذا هو قد أُعطِيَ شَطرَ الحُسنِ
সমুদয় সৌন্দর্যের অর্ধেক দেওয়া হয়েছে তাঁকে।
চতুর্থ আসমানে হযরত ইদ্রিস আলাইহিস সালাম এর সাথে সাক্ষাৎ। তিনি আনন্দভরে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বাগত জানান ।
পঞ্চম আসমানে হযরত হারুন আলাইহিস সালামের সাথে সাক্ষাৎ। তিনি ছিলেন বনি ইসরাইলের অত্যন্ত জনপ্রিয় নবি। তাঁর আচরণে ছিল কোমলতা, দয়া ও সভ্যতা। এজন্য তাঁর সাক্ষাৎ নবি সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লামের জন্য অতিরিক্ত সম্মানের অনুভুতি তৈরি করে। তিনি বলেন:
مرحبا بالنبي الصالحِ والأخِ الصالحِ
ষষ্ঠ আসমানে হযরত মুসা আলাইহিস সালামকে দেখতে পান।
فأتيت على موسى عليه السلام. فسلمت عليه، فقال مرحبا بالأخ الصالح والنبي الصالح، فلما جاوزته بكى فنودي ما يبكيك قال رب ،هذا غلام بعثته بعدي يدخل من أمتي الجنة أكثر مما يدخل من أمتي
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তারপর আমরা ষষ্ঠ আসমানে গিয়ে পৌঁছি। সেখানে হযরত মুসা আলাইহিস সাল্লামের নিকট গিয়ে তাকে সালাম করি। তিনি বলেন, মারহাবা, হে সুযোগ্য নবি! সুযোগ্য ভ্রাতা! এরপর আমি তাঁকে অতিক্রম করে গেলে তিনি কাঁদতে শুরু করেন।আওয়াজ আসলো, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি উত্তরে বললেন, প্রভু এ বালককে আপনি আমার পরে প্রেরণ করেছেন; অথচ আমার উম্মত অপেক্ষা তার উম্মত অধিক পরিমাণে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬২)
হযরত মুসা আলাইহিস সালামের কান্নার কারণ হিংসা নয়, কারণ আখেরাতে হিংসার কোন স্থান নেই। সাধারণ মুমিনের মাঝেও তা থাকবে না; নবি-রাসুল ও নেককারের মাঝে তো অকল্পনীয়। হযরত মুসা আলাইহি ওয়া সাল্লামের কান্নার কারণ হলো, আল্লাহ তাআলা নবিদের অন্তরে উম্মতের সীমাহীন ব্যথা ও স্নেহ রেখেছেন। তাই হযরত মুসা আলাইহিস সালাম তার উম্মতের অবস্থা ভেবে কান্নাকাটি করেছেন। এতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাহাত্ম্য প্রকাশ করা উদ্দেশ্য।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সপ্তম আসমানে ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের সাক্ষাৎ পেলাম। তিনি বাইতুল মামুরে পিঠ লাগিয়ে বসে আছেন।
বাইতুল মা’মুর হল আসমানি মসজিদ, যা কা’বা শরীফের বরাবর উপরে অবস্থিত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
وإذا هو يدخُلُه كُلَّ يومٍ سَبعون ألْفَ مَلَكٍ لا يعودون إليه
প্রতিদিন ৭০ হাজার ফেরেশতা এই ঘরে প্রবেশ করে এবং দ্বিতীয়বার তাদের আর প্রবেশ করার সুযোগ হয় না।
ثم ذهب بي إلى السدرة المنتهى
তারপর জিব্রাইল আমাকে সিদরাতুল মুনতাহা নিয়ে গেলেন। সিদরাতুল মুনতাহা হলো একটি বরই গাছ। এটির গোড়া ষষ্ঠ আকাশে আর ডালপালা সপ্তম আকাশে যেন এই গাছটি ষষ্ঠ আকাশেও আবার সপ্তম আকাশেও।
আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সাত আসমান, সাত জমিন জাহান্নামের এলাকা, আর জান্নাত হল সপ্তম আকাশের উর্ধ্বে। জান্নাতের ছাদ হলো আল্লাহ তাআলার আরশে আজিম। যেন সিদরাতুল মুনতাহার গোড়া যেটি ষষ্ঠ আকাশে এটি জাহান্নামের সীমানা। আর এর শাখা রয়েছে সপ্তম আকাশে ও ঊর্ধ্বে জান্নাতের সীমানায়, এই জন্য ও এটাকে সিদরাতুল মুনতাহা বলে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সিদরাতুল মুনতাহায় গিয়ে দেখলাম, সেখানকার পরিবেশ এমন যে বিভিন্ন রং সেখানকার পরিবেশ ঢেকে রেখেছে। কিন্তু সেই রঙের হাকিকত আমি জানতে পারিনি। কুরআনে কারিমের সেই হাকিকত স্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করেন,
﴿ إِذْ يَغْشَى السِّدْرَةَ مَا يَغْشَىٰ﴾
যখন সিদরাতুল মুনতাহাকে যে বস্তু আচ্ছাদিত করে, তা তাকে আচ্ছাদিত করছিল। সূরা আন নাজম-১৬
মুসলিম শরীফের বর্ণনায় فراش من ذهب শব্দ এসেছে।
অর্থাৎ সে গাছে ছিল বিচিত্র রঙ্গের স্বর্ণের প্রজাপতি। রাসুল সাল্লাল্লাহু ইরশাদ করেন, অতঃপর আমাকে জান্নাত ভ্রমণ করানো হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে জান্নাত সিদরাতুল মুনতাহার পরে কারণ ক্রমাগত তাকে উপরের দিকে আরোহণ করানো হয়েছে।
জান্নাতে প্রবেশ করে দেখলেন, حبائل اللؤلؤ তথা মতির ঝালর ঝুলে আছে। যেমন দুনিয়াতে রাজা-বাদশাদের ঘরে ঝাড়বাতি ঝুলানো থাকে।
জান্নাত ও জাহান্নাম ভ্রমণ
এই মহাসফরে তিনি আল্লাহর নির্দেশে আসমানি জগতের বহু দৃশ্যাবলি দেখেছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেন:
عُرِضَتْ عَلَيَّ الجَنَّةُ وَالنَّارُ
আমার সামনে জান্নাত ও জাহান্নাম উভয় প্রদর্শিত হয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৮০১)
মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখেছেন জান্নাতের অপূর্ব সৌন্দর্য। নদীর পানি দুধের মত সাদা, ফল ঝুলন্ত, গাছগুলো ফলের ভারে নত, বাতাস শান্তিময়। এই দৃশ্য মুমিনদের হৃদয়ে আশা জাগায়, নেক আমলের প্রতি উৎসাহ যোগায়। জান্নাতের সৌন্দর্য ও অলঙ্করণ অপূর্ব। নবি সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম বলেন:
وَجَنَّةٍ عَرْضُها السَّماواتُ والْأَرْضُ
জান্নাতের প্রস্থ আসমান সমূহ ও পৃথিবীর সমান।
এতে বুঝা যায় আল্লাহর নেক বান্দাদের জন্য অশেষ প্রতিদান ও অজস্র নেয়ামত প্রস্তুত রয়েছে। এছাড়াও নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
فمَن كانَ مِن أهْلِ الصَّلاةِ دُعِيَ مِن بابِ الصَّلاةِ، ومَن كانَ مِن أهْلِ الجِهادِ دُعِيَ مِن بابِ الجِهادِ، ومَن كانَ مِن أهْلِ الصَّدَقَةِ دُعِيَ مِن بابِ الصَّدَقَةِ، ومَن كانَ مِن أهْلِ الصِّيامِ دُعِيَ مِن بابِ الصِّيامِ، وبابِ الرَّيّانِ،
যারা নামাজে নিয়মিত ছিলেন তাদের নামাজের দরজা দিয়ে, যারা জিহাদে জীবন কাটিয়েছেন তাদের জিহাদের দরজা দিয়ে, যারা সদকা করতেন তাদের সদকার দরজা দিয়ে এবং রোজাদারদের ‘রাইয়ান’ নামক তোরণ দিয়ে ডাকা হবে। এটি শিক্ষা দেয় যে, নেক কাজের জন্য আলাদা মর্যাদা ও সুবিধা রয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬৬৬)
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
فدخلت الجنة فإذا فيها نهران
আমি জান্নাতে প্রবেশ করলাম সেখানে দুটি নদী প্রবাহিত।
আমলের প্রতি উৎসাহ
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :
وَعَنِ ابنِ مَسعُودٍ قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ لَقِيْتُ إِبْرَاهِيْمَ لَيْلَةَ أُسْرِيَ بِيْ فَقَالَ : يَا مُحَمّدُ أَقْرِئْ أُمَّتَكَ مِنِّي السَّلاَمَ وَأَخْبِرْهُمْ أَنَّ الجَنَّةَ طَيَّبَةُ التُّرْبَةِ عَذْبَةُ الْمَاءِ وَأَنَّهَا قِيْعَانٌ وَأَنَّ غِرَاسَهَا: سُبْحَانَ اللهِ وَالحَمْدُ للهِ، وَلَا إِلٰـهَ إِلاَّ اللهُ وَاللهُ أَكْبَرُ
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মেরাজের রাতে হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের সাথে আমার সাক্ষাৎ হলে তিনি বললেন, হে মুহাম্মদ! আপনি আপনার উম্মতকে আমার পক্ষ থেকে সালাম পৌঁছাবেন। এবং সংবাদ প্রদান করবেন যে, জান্নাতের জমিন সুগন্ধময় ও জলাধারগুলোতে রয়েছে সুমিষ্ট পানি। জান্নাতে গাছপালা নেই। (দুনিয়াতে) সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার বলার মাধ্যমে সেখানে বৃক্ষরোপণ করা যায়। (তিরমিজি, হাদিস: ৩৪৬২)
সুতরাং আমরা জান্নাতে বেশি বেশি গাছ লাগাতে পারব এসব তাসবিহ পাঠের মাধ্যমে।
মেরাজের সময় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখেছেন জাহান্নামের ভয়াবহতা। তিনি বলেন:
قالَ: أُرِيتُ النّارَ فَلَمْ أرَ مَنْظَرًا كاليَومِ قَطُّ أفْظَعَ.
আমাকে জাহান্নাম দেখানো হয়েছে, এর চেয়ে ভয়ঙ্কর দৃশ্য আমি কখনো দেখিনি। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯০৭)
এই দৃশ্য মানুষকে পাপ থেকে বিরত রাখে, এবং নেক কাজের প্রতি সচেতন করে।
মেরাজে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখেছেন যে, জাহান্নামের অধিকাংশ অধিবাসী নারী। তিনি বলেন, رأيت أكثر أهلها النساء আমি দেখলাম জাহান্নামের অধিকাংশ অধিবাসী নারী। কারণ, স্বামীর প্রতি অকৃতজ্ঞতা, গিবত, পরনিন্দা ও অন্যায় আচরণ। এই সতর্কতা আমাদের শেখায় নারী-পুরুষ উভয়কে তাদের নৈতিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। জাহান্নামের আরো ভয়াবহ দৃশ্য রয়েছে। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে দেখেছিলেন, সুদখোরদের পেট ফুলে গেছে:
أَتَيْتُ ليلةَ أُسْرِيَ بي على قومٍ بطونُهُم كالبيوتِ فيها الحَيّاتُ تُرى من خارجِ بطونِهِم، فقلتُ: من هؤلاءِ يا جبريلُ؟ قال: هؤلاءِ أَكَلَةُ الرِّبا
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:মেরাজের রাতে আমি এমন এক শ্রেণীর লোকদের নিকট পৌঁছলাম, যাদের পেট বিশাল ঘরের ন্যায় প্রকাণ্ড; যার ভেতর রয়েছে অনেক সাপ। পেটের বাহির থেকে ওসব দেখা যাচ্ছে। আমি সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? তিনি বললেন, এরা সুদখোর। (সুনানু ইবনু মাজাহ, হাদিস: ২২৭৩)
নামাজ ফরজ হওয়া:
সবকিছু অতিক্রম করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটি উঁচু জায়গায় পৌঁছে দেওয়া হয়। সেখানে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফেরেশতাদের দপ্তরে কলম চালানোর খসখস শব্দ পেলেন।
এরপর নবি কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
فَفَرَضَ عَلَيَّ خَمْسِينَ صَلاةً في كُلِّ يَومٍ ولَيْلَةٍ، فَنَزَلْتُ إلى مُوسى ﷺ، فقالَ: ما فَرَضَ رَبُّكَ على أُمَّتِكَ؟ قُلتُ: خَمْسِينَ صَلاةً، قالَ: ارْجِعْ إلى رَبِّكَ فاسْأَلْهُ التَّخْفِيفَ، فإنَّ أُمَّتَكَ لا يُطِيقُونَ ذلكَ، فإنِّي قدْ بَلَوْتُ بَنِي إسْرائِيلَ وخَبَرْتُهُمْ، قالَ: فَرَجَعْتُ إلى رَبِّي، فَقُلتُ: يا رَبِّ، خَفِّفْ على أُمَّتِي، فَحَطَّ عَنِّي خَمْسًا، فَرَجَعْتُ إلى مُوسى، فَقُلتُ: حَطَّ عَنِّي خَمْسًا، قالَ: إنَّ أُمَّتَكَ لا يُطِيقُونَ ذلكَ، فارْجِعْ إلى رَبِّكَ فاسْأَلْهُ التَّخْفِيفَ، قالَ: فَلَمْ أزَلْ أرْجِعُ بيْنَ رَبِّي تَبارَكَ وتَعالى، وبيْنَ مُوسى عليه السَّلامُ حتّى قالَ: يا مُحَمَّدُ، إنَّهُنَّ خَمْسُ صَلَواتٍ كُلَّ يَومٍ ولَيْلَةٍ، لِكُلِّ صَلاةٍ عَشْرٌ، فَذلكَ خَمْسُونَ صَلاةً
আমার উপর দিনরাতে মোট ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করলেন। এরপর, হযরত মুসা আলাইহিস সালামের নিকট প্রত্যাবর্তন করলাম। তিনি আমাকে বললেন, আপনার প্রতিপালক আপনার প্রতি কী ফরজ করেছেন? আমি বললাম ৫০ ওয়াক্ত নামাজ। তিনি বললেন, আপনার প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তন করুন এবং একে আরো সহজ করার আবেদন করুন। আপনার উম্মত এই নির্দেশ পালন করতে পারবে না।
আমি বনি ইসরাইলকে পরীক্ষা করেছি এবং তাদের বিষয়ে আমি অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তখন আমি আবার প্রতিপালকের কাছে ফিরে গেলাম এবং বললাম হে আমার রব! আমার উম্মতের জন্য এই হুকুম সহজ করে দিন। ফলে পাঁচ ওয়াক্ত কমিয়ে দেওয়া হলো। অতঃপর হযরত মুসা আলাইহিস সালামের নিকট ফিরে এসে বললাম, আমার থেকে পাঁচ ওয়াক্ত কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বললেন, আপনার উম্মত এটাও পারবে না। আপনি ফিরে যান এবং আরো সহজ করার জন্য আবেদন করুন। রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেন এভাবে আমি একবার হযরত মুসা আলাইহিস সালাম এর কাছে এবং একবার আল্লাহর কাছে আসা-যাওয়া করতে লাগলাম। পরিশেষে আল্লাহ তাআলা বলেন
হে মুহাম্মাদ! দিন রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হলো। প্রতি ওয়াক্ত নামাজে দশ ওয়াক্ত নামাজের সমান সওয়াব রয়েছে। এভাবে পাঁচ ওয়াক্ত হলো পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজের সমান। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬২)
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসা আ. -এর পরামর্শে মোট ৯ বার আল্লাহ তাআলার কাছে গিয়েছিলেন এবং পাঁচ ওয়াক্ত করে ৪৫ ওয়াক্ত নামাজ আল্লাহ তাআলা কমিয়েছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
فَنَزَلْتُ حتّى انْتَهَيْتُ إلى مُوسى ﷺ، فأخْبَرْتُهُ، فقالَ: ارْجِعْ إلى رَبِّكَ فاسْأَلْهُ التَّخْفِيفَ، فقالَ رَسولُ اللهِ ﷺ: فَقُلتُ: قدْ رَجَعْتُ إلى رَبِّي حتّى اسْتَحْيَيْتُ منه.
তারপর আমি হযরত মুসা আলাইহিস সালাম এর কাছে নেমে এলাম এবং তাঁকে এ বিষয়ে অবহিত করলাম। তিনি তখন বললেন, আপনার প্রতিপালকের কাছে ফিরে যান এবং আরো সহজ করার প্রার্থনা করুন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ বিষয়ে বারবার আমি আমার রবের কাছে আসা-যাওয়া করেছি। এখন পুনরায় যেতে সংকোচ বোধ করছি। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬২)
নামাজ পড়বো পাঁচ ওয়াক্ত কিন্তু সওয়াব পাবো পঞ্চাশ ওয়াক্তের। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
ومَن هَمَّ بحَسَنَةٍ فَلَمْ يَعْمَلْها كُتِبَتْ له حَسَنَةً، فإنْ عَمِلَها كُتِبَتْ له عَشْرًا
যে ব্যক্তি কোন ভাল কাজের ইচ্ছা করলো এবং তা কাজে পরিণত করতে পারল না তার জন্য একটি সওয়াব লেখা হবে। আর তা কাজে রূপায়িত করলে তার জন্য লেখা হবে দশটি সওয়াব। (প্রাগুক্ত)
অর্থাৎ নামাজ পাঁচ ওয়াক্তের কিন্তু সওয়াব পঞ্চাশ ওয়াক্তের। তা এভাবে যে, এক ওয়াক্ত নামাজের দশ ওয়াক্তের সওয়াব দেওয়া হবে। অর্থাৎ, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজের সওয়াব দেওয়া হবে। এই পরিবর্তনটা হলো এমন, যেমন হযরত দাউদ আলাইহিস সালামের ষাট বছর পূর্ণ হওয়ার পর হযরত আদম আলাইহিস সালাম এর আবেদনে স্বীয় বয়স হতে হযরত দাউদ আলাইহিস সালামকে চল্লিশ বছর দেওয়া হয়েছিল। ফলে তাঁর হায়াত পূর্ণ একশত বছর হয়েছিল। সেখানে ষাটকে একশত বানানো হয়েছে আর এখানে পঞ্চাশ কে পাঁচ বানানো হয়েছে। যদিও পঞ্চাশকে পাঁচ বানানো হয়েছে কিন্তু তা সত্ত্বেও একটু চিন্তা করুন, যে প্রথমেই আল্লাহ তায়ালার এলেমে কোন পরিবর্তন পরিবর্ধন ছিল না। কারণ, আল্লাহ তায়ালা তো জানতেন, যে হযরত দাউদ আলাইহিস সালামের বয়স একশত বছর হবে। তবে তা এভাবে হবে যে, হযরত আদম আলাইহিস সালাম হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম এর জন্য আরো চল্লিশ বছর বৃদ্ধির আবেদন করবেন, আর আল্লাহ তা'আলা তা মঞ্জুর করবেন। এখানেও ঠিক তাই হয়েছে। পঞ্চাশকে পাঁচ করা হয়েছে, তবে এই পাঁচকে পঞ্চাশের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে । আর তা এভাবে যে, উম্মতের সওয়াব দশ গুণ বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়েছে। ফলে দুনিয়ার হিসাবে পাঁচ কিন্তু আখেরাতের সওয়াবের দপ্তরে পঞ্চাশ লেখা হবে।
মেরাজে নামাজ ফরজ হওয়ার হেকমত
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালাহি রাহি. লাইলাতুল মেরাজে নামাজ ফরজ হওয়ার ব্যাপারে হেকমত বর্ণনা করে লিখেছেন, আল্লাহ তা'আলা জমজমের পুতঃপবিত্র পানি দ্বারা রাসুল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লামের অন্তর মোবারক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেছিলেন এবং ঈমান ও হেকমত দ্বারা তাঁর অন্তর পূর্ণ করে দিলেন। নিয়মও অনুরূপ, প্রথমে পবিত্রতা অর্জন করতে হয়। সুতরাং, এরপরে নামাজ ফরজ হওয়া যুক্তিযুক্ত। এরদ্বারা সকল ফেরেশতাগণের উপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাহাত্ম্যের, বড়ত্বের দিকে ইশারা করা হয়েছে। প্রথমে তাঁকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণভাবে শোধিত করা হয়েছে। অতঃপর মেরাজের আহ্বান করে একান্ত প্রেমালাপ হয়েছে। নামাজ ও আল্লাহ তায়ালার সাথে প্রেম আলাপ করার মাধ্যম। আর এই প্রেম আলাপের সুযোগ ও সৌভাগ্য প্রত্যেক মুসলমানকে দেওয়া হয়েছে। যে প্রতিদিন অজু সহকারে নামাজ পড়ে আল্লাহ তাআলার সাথে একান্ত আলাপ করে সে বিশেষ মর্যাদা ও নৈকট্য অর্জন করে। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি রাহি. অন্যত্র আরেকটি হেকমত বর্ণনা করেছেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেরাজের রাতে ফেরেশতাগণের ইবাদত অবলোকন করলেন, কেউ কেউ কিয়ামে, কেউ কেউ রুকুতে এবং কেউ কেউ সিজদায় রয়েছেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় উম্মতের জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট এমন কিয়াম, রুকু ও সিজদা সমৃদ্ধ একটি পূর্ণাঙ্গ ইবাদতের আবেদন করলেন। আল্লাহ তায়ালা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিজের কাছে ডেকে নামাজ ফরজ করে দিলেন। এর দ্বারা নামাজের বড়ত্ব, গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য বোঝা যায়। ফেরেশতার মাধ্যমে নামাজের বিধান দেওয়া হয়নি, যেমন অন্যান্য বিধান দেওয়া হয়েছে।
মেরাজের পর মক্কার কাফেরদের প্রতিক্রিয়া
মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেরাজের মহাসফর শেষে মক্কায় ফিরে আসেন। তখন মক্কার কাফেররা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অবিশ্বাস ও অবজ্ঞা প্রকাশ করছিল। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যক্ষ করেছিলেন তাদের প্রকৃত অবস্থা। এবং আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী তাদের জন্য সতর্ক করেছিলেন এবং দলিল উপস্থাপন করেছিলেন। মুশরিকরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করার জন্য বায়তুল মুকাদ্দাস সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিল; তথা তার দরজা, জানালা ও স্তম্ভ সম্পর্কে। যেমন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :
لَمّا كَذَّبَتْنِي قُرَيْشٌ قُمْتُ في الحِجْرِ فَجَلّى اللَّهُ لي بَيْتَ المَقْدِسِ، فَطَفِقْتُ أُخْبِرُهُمْ عن آياتِهِ وأنا أنْظُرُ إلَيْهِ.
আমি হাজরে আসওয়াদের পার্শ্বে গিয়ে দাঁড়ালাম। অতঃপর আল্লাহ তাআলা আমার সম্মুখে বাইতুল মাকদিসকে উদ্ভাসিত করে দিলেন। আর আমি যেন চোখে দেখে তার সকল নিদর্শন বলে যেতে পারলাম। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৭১০)
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে বায়তুল মুকাদ্দাসের চিত্র পেশ করা হয়েছিল যেমন বর্তমানে টেলিভিশনের চিত্র পেশ করা হয়। উল্লেখ্য, যে মুশরিক সম্প্রদায় কর্তৃক রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বাইতুল মাকদিসের এতো বিস্তারিত বিবরণ চাওয়া ছিল সীমাহীন অনর্থক কাজ। এর উত্তর দেয়ার কোন প্রয়োজন ছিল না। নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাবি ছিল অন্ধকার রাতে মেরাজ হয়েছে এবং দ্রুতগামী বোরাকের উপর আরোহন করে বায়তুল মাকদিসে গিয়ে শুধু দুই রাকাত নামাজ পড়ার সময় পর্যন্ত সেখানে দেরি করেছেন। এরপর আকাশে চলে গেছেন। অন্ধকার রাতের সফরের রাস্তার জিনিস সম্পর্কে কে জানবে? বিশেষত দ্রুতগামী যানবাহনে আরোহন করে গেলে তো রাস্তার খবর সম্পর্কে মোটেই অবগত না হওয়ার কথা। অতএব, এসব প্রশ্ন নিতান্ত অনর্থক। আল্লাহ তাআলা শত্রুদের সামনে নবিগণের মাথা উঁচু রাখেন, পরাজয়ের কোনো সুযোগ রাখেন না।
মক্কা থেকে মসজিদুল আকসা এবং সেখান থেকে আসমানে নিয়ে যাওয়ার হেকমত হলো, যদি মক্কা থেকে সরাসরি আসমানে নিয়ে যাওয়া হতো তবে পৌত্তলিকদের মুখ বন্ধ করার কোন উপায় থাকতো না। কারণ আখেরাতের অবস্থা সম্পর্কে তারা ওয়াকিফহাল ছিল না, কিন্তু বাইতুল মাকদিস সম্পর্কে তাদের জানা ছিল। যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইতুল মাকদিসের নিদর্শনাবলি সঠিকভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন, তখন তাদের বাধ্য হয়েই স্বীকার করতে হয়েছে। যেহেতু এতটুকু অংশের সঠিক তথ্য তিনি দিয়েছেন তাহলে মেরাজের অবশিষ্ট ঘটনাগুলো সত্যই বলবেন। কারণ একই সফরে বাইতুল মাকদিসে গিয়েছেন এবং মেরাজও হয়েছে।
মেরাজ থেকে ফেরার পর মক্কার মুশরিকরা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কেউ বলেছে পাগল, কেউ অপমান করার চেষ্টা করেছে। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে তাদের চাওয়া অনুযায়ী দলিল-প্রমাণসহ সব তথ্য দেওয়ার পরেও যাদের নসিবে ঈমান নেই তারা ঈমান আনেনি। মক্কার কাফেরদের অবিশ্বাস, ঠাট্টা- বিদ্রুপ সত্তেও আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধৈর্যের সাথে ঈমানের দাওয়াত প্রদানে অবিচল ছিলেন। মেরাজ থেকে ফেরার পর কাফেরদের প্রতিক্রিয়া আমাদের স্মরণ করায় যে নেক কাজে, ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রাখতে হবে। ইমানের পথে যত বাধা আসুক, ইমানের দাওয়াত থেকে চুল পরিমাণ সরে আসার সুযোগ নেই। এবং মেরাজে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে উম্মতে মুহাম্মদির জন্য সবচাইতে বড় উপহার পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ঠিকমত আদায় করার তাওফিক দান করুক।