বর্ষ: ১, সংখ্যা: ১
রজব, শাবান, রমজান - ১৪৪৭ | ডিসেম্বর - ২০২৫, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি - ২০২৬
কুরআন যেন হয় আমাদের হৃদয়ের বসন্ত মুফতি মুহাম্মাদ ফয়জুল্লাহ
কুরআন যেন হয় আমাদের হৃদয়ের বসন্ত
মুফতি মুহাম্মাদ ফয়জুল্লাহ
প্রিয় হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে দীর্ঘ ভূমিকার পর নিম্নোক্ত দুআটি করেছিলেন:
أن تجْعَلَ القُرْآنَ رَبِيعَ قَلْبِي وَنُورَ صَدْرِي وَجَلَاءَ حُزْنِي وَذَهَابَ هَمِّي
অর্থ: হে আল্লাহ! কুরআনকে আমার হৃদয়ের বসন্ত, আমার প্রানের জ্যোতি, আমার বেদনার উপশম এবং আমার দুশ্চিন্তা মুক্তির উপায় বানিয়ে দিন। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং : ৩৭১২)
শীতের শেষে বসন্তের আগমনে প্রকৃতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়। গাছপালা নতুন পাতায় ভরে যায়। বাগানে নানা রঙের ফুল ফোটে। সর্বত্র সুখ-শান্তি, সমৃদ্ধি, আনন্দ-খুশি ও উদ্যমতার উপলক্ষ তৈরী হয়। ফলে বসন্তের প্রতি থাকে মানুষের হৃদয়জ আকর্ষণ। মনেপ্রাণে তাকে আকাঙ্ক্ষা করে এবং তার আগমনের অপেক্ষায় উদগ্রীব থাকে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন, যেন কুরআনকে তাঁর হৃদয়ের বসন্ত বানিয়ে দেওয়া হয়; যা সদা তাঁর হৃদয়কে সজীব ও সতেজ রাখবে। আনন্দ-খুশি, সুখ-শান্তি, সমৃদ্ধি, ভালোবাসা ও ভালোলাগার উপলক্ষ হবে।
মহিমান্বিত কুরআন হলো রাব্বুল আলামিন কর্তৃক নাজিলকৃত সকল গ্রন্থের শ্রেষ্ঠতম। যার আদ্যোপান্ত হিদায়াত ও মুমিনের জন্য পরিপূর্ণ রহমত। কুরআন নসিহত ও উপদেশের মহাসম্ভার। মানবাত্মার যাবতীয় ব্যাধির অব্যর্থ শিফা ও উপশম। মহামহীয়ান প্রভুর শাহী ফরমান। শ্রেষ্ঠ মাখলুক মানব জাতির হিদায়াত লাভের এক দীপ্ত আলোকশিখা। দুনিয়াবি সফলতা, আখিরাতের নাজাত ও মুক্তির শাশ্বত পথ নির্দেশনা। উম্মতে মুহাম্মদিকে দেয়া খোদাপ্রদত্ত নিয়ামতগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠতম অফুরন্ত এক নেয়ামত। এই মহা নেয়ামতের সঠিক কদর ও সর্বোচ্চ হক আদায় করেছিলেন প্রিয় হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম রাযি.। অজ্ঞতা, অবহেলা, অযোগ্যতা ও অলসতার কারণে আমরা এই মহানিয়ামতের যথোপযুক্ত কদর করিনা। বিষয়টা আফসোসের!
কুরআন কারিমের হক
ইমানদার হিসেবে আমাদের উপর কুরআনুল কারিমের অনেকগুলো হক রয়েছে। মোটা দাগে কয়েকটি হলো:
১. কুরআনের প্রতি ইমান আনয়ন করা। অর্থাৎ কুরআনুল কারিম যে আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিনের কালাম এবং তা তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর নাজিল করেছেন তা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা।
২. সহিশুদ্ধভাবে কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করা
৩. কুরআনুল কারিমের আয়াতগুলোতে সাধ্যানুযায়ী তাদাব্বুর-তাফাক্কুর তথা চিন্তা ও গবেষণা করা।
৪. কুরআনে বর্ণিত আদেশগুলো পালন করা, নিষেধগুলো বর্জন করা।
৫. কুরআন থেকে তার মর্ম ও বিধান উদঘাটন করা।
৬. নিজে কুরআন শেখা এবং যারা কুরআন পড়তে জানে না তাদেরকে কুরআন শেখানো।
৭. কুরআনের বিধান সমাজে প্রতিষ্ঠা করা।
৮. কুরআন শরিফ মুখস্ত করা।
৯. ধারাবাহিকভাবে তিলাওয়াত করে কুরআন খতম করা।
১০. কুরআনকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসা।
উক্ত হকগুলোর মধ্যে কুরআনুল কারিমের বিশুদ্ধ তিলাওয়াত অন্যতম একটি হক যা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অবশ্য পালনীয় ইবাদাত। বিষয়টি পবিত্র কালামুল্লাহ পাকে এভাবে চিত্রায়িত হয়েছে:
الذين آتَيْنَاهُمُ الكِتَابَ يَتْلُونَهُ حَقَّ تِلَاوَتِهِۚ أُولٰئِكَ يُؤْمِنُونَ بِهِ
অর্থ: যাদেরকে আমি কিতাব (কুরআন) দান করেছি, তারা হক আদায় করে তিলাওয়াত করে। যারা হক আদায় করে তিলাওয়াত করে কেবল তারা এই কুরআনের উপর (পূর্ণ) ইমান রাখে। (সুরা বাকারাহ আয়াত: ১২১)
এই আয়াতের মাফহুমে মুখালিফ (বিপরীতমূখী মর্ম) দ্বারা বোঝা যায়, যারা কুরআনুল কারিমের হক আদায় করে তিলাওয়াত করে না। তারা কুরআনের প্রতি (পূর্ণাঙ্গরূপে) ইমান আনয়ন করে না। যারা বিশুদ্ধ তিলাওয়াত জেনেও হক আদায় করে তিলাওয়াত করে না, যারা তিলাওয়াত করে; তবে অশুদ্ধভাবে এবং যারা বিশুদ্ধ তিলাওয়াত জানে না এবং তিলাওয়াতও করে না তারা সকলে উল্লিখিত হুকুমে শামিল।
কুরআনুল কারিম তিলাওয়াতের ফজিলত
কুরআনুল কারিম তিলাওয়াতের মাধ্যমে দুনিয়াতে আল্লাহর প্রতি ইমান বা বিশ্বাস ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। দিল ও দেমাগ হয় স্বচ্ছ ও প্রশান্ত। হায়াত ও রিজিকে নেমে আসে সীমাহীন বরকত। ঘোর অন্ধকার কবরে তিলাওয়াতকারীর জন্য কুরআন হবে আলোকবর্তিকা। কেয়ামতের ময়দানে আল্লাহর আদেশে হবে সুপারিশকারী। জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ এবং জান্নাত লাভের মহামাধ্যম।
তিলাওয়াতকারী পাবে প্রতিটি অক্ষরের বিনিময়ে দশটি করে নেকি
পবিত্র কুরআনুল কারিম পৃথিবীর একমাত্র গ্রন্থ যার পাঠককে মহান রাব্বুল আলামিন দান করে থাকেন প্রতিটি অক্ষরে এমন একটি নেকি যা দশটি নেকির সমতুল্য। প্রখ্যাত সাহাবি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. সূত্রে বর্ণিত:
عن ابن مسعود رضي الله عنه قالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: «مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللهِ فَلَهُ حَسَنَةٌ، وَالحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا، لَا أَقُولُ: الم حَرْفٌ وَلَكِنْ أَلِفٌ حَرْفٌ وَلَامٌ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ
হযরত ইবনে মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কিতাবুল্লাহ থেকে একটি অক্ষর তিলাওয়াত করে তার জন্য রয়েছে একটি নেকি, আর উক্ত নেকিটি দশটি নেকির সমতুল্য। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি বলছি না الم একটি হরফ বরং الف একটি হরফ لام একটি হরফ ميم একটি হরফ। (তিরমিজি হাদিস নং: ২৯১০)
অর্থাৎ الم পাঠ করলে সর্বমোট ত্রিশটি নেকি পাওয়া যাবে। এখানে একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, অনেককে বলতে শোনা যায় যে, অর্থ না বুঝে কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করলে কোন লাভ নেই। তাদের এ কথা নিতান্ত মনগড়া। কুরআনুল কারিমের অর্থ বুঝে তিলাওয়াত করা তো মহাসৌভাগ্যের ব্যাপার। তবে বিশুদ্ধ মতানুসারে, অর্থ না বুঝে তিলাওয়াত করলেও নেকি পাওয়া যায়। নির্ভরযোগ্য মুফাসসিরীনে কেরামের বর্ণনামতে الم শব্দের অর্থ একমাত্র আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন জানেন (অন্য কেউ জানেন না)। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত শব্দের মাধ্যমেই দৃষ্টান্ত পেশ করে বলেছেন যে, এর প্রতিটি অক্ষর তেলাওয়াতে এমন একটি নেকি পাওয়া যায় যা দশটি নেকি সমতুল্য। সুতরাং বোঝা গেল অর্থ না বুঝে তিলাওয়াত করলেও প্রতিটি হরফে দশটি নেকি পাওয়া যাবে।
উচ্চস্বরে ও অনুচ্চস্বরে তিলাওয়াতের উপকারিতা
কুরআনুল কারিমের তিলাওয়াত উচ্চস্বরে হোক কিংবা অনুচ্চস্বরে সর্বাবস্থায় তা একটি মহামূল্যবান ইবাদত। হযরত উকবা ইবনে আমির রাযি. থেকে বর্ণিত,
عن عُقبة بن عامر رضي الله عنه قالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَقُولُ: «الجَاهِرُ بِالقُرْآنِ كَالجَاهِرِ بِالصَّدَقَةِ، وَالمُسِرُّ بِالقُرْآنِ كَالمُسِرِّ بِالصَّدَقَةِ.
অর্থ: হযরত উকবা ইবনে আমির রাযি. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি তিনি বলেন, (সাওয়াবের ক্ষেত্রে) প্রকাশ্যে তথা উচ্চস্বরে তিলাওয়াতকারী প্রকাশ্যে দানকারীর সমতুল্য আর অপ্রকাশ্যে তথা অনুচ্চস্বরে তিলাওয়াতকারী গোপনে সদকাকারীর সমতুল্য। (তিরমিজি হাদিস নং: ২৯১৯)
ইমাম তিরমিজি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, এই হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, অনুচ্চস্বরে তিলাওয়াতকারী উচ্চস্বরে তিলাওয়াতকারী অপেক্ষা উত্তম। কারণ, উলামায়ে কেরাম বলেছেন, গোপনে দান করা প্রকাশ্যে দান করা অপেক্ষা উত্তম। বলার কারণ হলো, গোপনে আমলকারী রিয়া ও অহংকার থেকে মুক্ত থাকতে পারে। (তবে নিজের মনোযোগ বৃদ্ধির জন্যে কিংবা অন্যদের উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে রিয়া ও উজব মুক্ত উচ্চস্বরের তিলাওয়াত ও অধিক সওয়াবের মাধ্যম হতে পারে।)
কুরআনুল কারিমের একেকটি আয়াতের তিলাওয়াত উঁচু কুঁজবিশিষ্ট উটনীর চেয়েও দামি
সুফফায় অবস্থানকারী অসহায় দরিদ্র সাহাবিগণ যারা অনাহারে অর্ধাহারে পড়ে থাকতেন মসজিদে নববির এক পার্শ্বে, ভালো করে সতর ঢাকার মতো একজোড়া কাপড়ের মালিক যারা ছিলেন না, তাঁরা মালিক হবেন মোটাতাজা উঁচু কুঁজবিশিষ্ট উটনীর! হ্যাঁ, সহজে অনেকগুলো উঁচু কুঁজবিশিষ্ট উটনীর মালিক হওয়ার চেয়ে দামি কিছুর মালিক হওয়ার উত্তম পদ্ধতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের বলে দিয়েছেন। হযরত উকবা ইবনে আমির রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বর্ণনায় এভাবে এসেছে:
عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ قَالَ: خَرَجَ إِلَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَنَحْنُ فِي الصُّفَّةِ فَقَالَ: «أَيُّكُمْ يُحِبُّ أَنْ يَغْدُوَ كُلَّ يَوْمٍ إِلَى بَطْحَانَ أَوْ الْعَقِيقِ فَيَأْتِيَ مِنْهُ بِنَاقَتَيْنِ كَوْمَاوَيْنِ فِي غَيْرِ إِثْمٍ وَلَا قَطِيعَةِ رَحِمٍ؟» ، قُلْنَا: بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ، كُلُّنَا نُحِبُّ ذَلِكَ، قَالَ: «أَفَلَا يَغْدُو أَحَدُكُمْ إِلَى الْمَسْجِدِ فَيُعَلِّمُ أَوْ يَقْرَأُ آيَتَيْنِ مِنْ كِتَابِ اللَّهِ خَيْرٌ مِنْ نَاقَتَيْنِ، وَثَلَاثٌ خَيْرٌ لَهُ مِنْ ثَلَاثٍ، وَأَرْبَعٌ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَرْبَعٍ، وَمِنْ أَعْدَادِهِنَّ مِنَ الْإِبِلِ
অর্থ: হযরত উকবা ইবনে আমির রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আসলেন। তখন আমরা সুফ্ফাহ্ বা মাসজিদের চত্বরে অবস্থান করছিলাম। তিনি বললেন: তোমরা কেউ চাও যে, প্রতিদিন “বুত্বহান” বা আক্বীক্বের বাজারে যাবে এবং সেখান থেকে কোন পাপ বা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা ছাড়াই বড় কুঁজবিশিষ্ট দু’টি উটনী নিয়ে আসবে? আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা এরূপ চাই। তিনি বললেন, তাহলে তোমাদের কেউ অতি প্রত্যুষে মসজিদে গিয়ে আল্লাহর কিতাবের দু’টি আয়াত শিখবে কিংবা পাঠ করবে ! এটা তার জন্য ঐরূপ দু’টি উটনীর চেয়েও উত্তম। এরূপ তিনটি আয়াত তিনটি উটনীর চেয়েও উত্তম এবং চারটি আয়াত চারটি উটনীর চেয়েও উত্তম। আর অনুরূপ সমসংখ্যক উটনীর চেয়ে তত সংখ্যক আয়াত উত্তম। (মুসলিম হাদিস নং: ১৭৫৮)
জামাতবদ্ধভাবে কুরআনুল কারিম তিলাওয়াতের ফজিলত
কুরআনুল কারিম একাকী নির্জনে তিলাওয়াত করলেও লাভ; আবার কোনো ঘর বা মসজিদে সম্মিলিতভাবে তিলাওয়াত করলেও রয়েছে অনেক ফযিলত। প্রখ্যাত সাহাবি হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বর্ণনায় জামাতবদ্ধভাবে তিলাওয়াতের উপকারিতাগুলো এভাবে ফুটে উঠেছে:
عن أبي هريرة رضي الله عنه قالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: «وَمَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللهِ يَتْلُونَ كِتَابَ اللهِ وَيَتَدَارَسُونَهُ بَيْنَهُمْ إِلَّا نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ وَحَفَّتْهُمُ المَلَائِكَةُ وَذَكَرَهُمُ اللهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ.
অর্থ: হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যদি কোন সম্প্রদায় আল্লাহর ঘরসমূহের মধ্য থেকে কোনো একটি ঘরে একত্রিত হয়ে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে এবং একে অপরের সাথে অধ্যয়ন করে তাঁদের উপর সাকিনা (বিশেষ ধরনের শান্তিধারা) নাযিল হয়, তাঁদেরকে আল্লাহর রহমত আচ্ছাদিত করে নেয়, ফেরেশতাগণ তাদেরকে বেষ্টন করে নেন এবং আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন তাঁর নৈকট্যশীল ফেরেশতাদের নিকটে তাদের আলোচনা করেন। (মুসলিম হাদিস নং: ৬৭৪৬)
নামাজে কুরআনুল কারিম তিলাওয়াতের ফজিলত
আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিনের পরম অনুগত একনিষ্ঠ বিনয়ী বান্দা যারা তাঁরা তাহাজ্জুদসহ অন্যান্য নামাজে তিলাওয়াতের মাধ্যমে হৃদয়ে প্রশান্তি অনুভব করে থাকেন এবং পরকালেও এর মাধ্যমে তাঁরা অনাবিল সুখ-শান্তির নীড় প্রস্তুত করতে সক্ষম হন। নামাজে তিলাওয়াতের অসংখ্য ফজিলতের কথা হাদিসের পাতায় এসেছে। বিখ্যাত সাহাবি হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বর্ণনায় এভাবে ফুটে উঠেছে:
عن أبي هريرة رضي الله عنه قالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: «أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ إِذَا رَجَعَ إِلَى أَهْلِهِ أَنْ يَجِدَ فِيهِ ثَلَاثَ خَلِفَاتٍ عِظَامٍ سِمَانٍ؟» قُلْنَا: نَعَمْ.
قَالَ: «فَثَلَاثُ آيَاتٍ يَقْرَؤُهُنَّ أَحَدُكُمْ فِي صَلَاتِهِ خَيْرٌ لَهُ مِنْ ثَلَاثِ خَلِفَاتٍ عِظَامٍ سِمَانٍ
অর্থ: হযরত আবু হুরায়রা রাযি. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের কেউ কি চাও যে যখন বাড়ি ফিরবে তখন বাড়িতে গিয়ে তিনটি বড় বড় মোটা তাজা গর্ভবতী উটনী দেখতে পাবে? আমরা বললাম, হ্যাঁ তিনি বললেন, তোমাদের কেউ নামাজের তিনটি আয়াত পাঠ করলে তা তার জন্য তিনটি মোটা তাজা গর্ভবতী উটনীর চেয়েও উত্তম হবে। (মুসলিম হাদিস নং: ১৭৫৭)
অর্থাৎ, নামাজে তিনটি আয়াত তিলাওয়াত করা মোটাতাজা তিনটি উটনীর মালিক হওয়া অপেক্ষা উত্তম কিংবা আল্লাহর রাস্তায় তিনটি মোটা তাজা উটনী দান করার সওয়াবের চেয়েও নামাজে তিনটি আয়াতের তিলাওয়াতের সওয়াব বেশি।
আল্লাহর নৈকট্যের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম তেলাওয়াতে কুরআন
প্রতিটি মুমিনের ইমানের দাবি, সে আল্লাহর নৈকট্যশীল বান্দা হবে এবং তাঁর নৈকট্যে অর্জনের যত পথ ও মাধ্যম আছে সেগুলো খুঁজে বের করে তদানুযায়ী যথাসাধ্য চেষ্টা ফিকির ও মুজাহাদার মাধ্যমে তা অর্জন করবে। আফসোসের বিষয় হলো, অসংখ্য সহজ মাধ্যম থাকা সত্ত্বেও অজ্ঞতা কিংবা প্রেরণার অভাবে আমরা সেই নৈকট্যের মহাসৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে গিয়ে সর্বোচ্চ কষ্টকর ইমানি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়ে নৈকট্যের মহাসাগরে অবগাহনকারী সাহাবিদের অন্যতম হযরত খাব্বাব ইবনে আরাত রাযি. অভিজ্ঞতার আলোকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের শ্রেষ্ঠ ও সহজ একটি মাধ্যম বলে দিয়েছেন:
قال خَبَّاب بن الأرَتّ رضي الله عنه تَقَرَّبْ إِلَى اللهِ مَا اسْتَطَعْتَ فَإِنَّكَ لَنْ تَتَقَرَّبَ إِلَيْهِ بِشَيْءٍ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ كَلَامِهِ
অর্থ: হযরত খাব্বাব ইবনে আরাত রাযিবলেন, যতটুকু সম্ভব আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিনের নৈকট্যতা অর্জন করো। তবে তাঁর কালাম অপেক্ষা তাঁর নিকটে অধিক প্রিয় অন্য কোন কিছুর মাধ্যমে তাঁর নৈকট্যতা অর্জন করতে সক্ষম হবে না। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা: ১০/৫১০)
পরকালে দক্ষ তিলাওয়াতকারীর বিরল সম্মাননা এবং আটকিয়ে তিলাওয়াতকারীর কষ্টের পুরস্কার
পরকালে আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন তাঁর কালামের দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের বিশেষভাবে পুরস্কৃত করবেন। আর যারা দক্ষ নয় তবে কুরআনকে ভালোবেসে দক্ষতা অর্জনের জন্য তিলাওয়াত অব্যাহত রেখেছেন তাদের জন্যও রেখেছেন মহামূল্যবান পুরস্কার। আম্মাজান আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত,
عن عائشة رضي الله عنها قالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: «المَاهِرُ بِالقُرْآنِ مَعَ السَّفَرَةِ الكِرَامِ البَرَرَةِ وَالَّذِي يَقْرَأُ القُرْآنَ وَيَتَتَعْتَعُ فِيهِ وَهُوَ عَلَيْهِ شَاقٌّ لَهُ أَجْرَانِ
অর্থ: আম্মাজান আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কুরআনে দক্ষ ব্যক্তি (পরকালে) নেকি লিপিকার সম্মানিত ফেরেশতাদের সাথে থাকবে। আর যে ব্যক্তি ঠেকে ঠেকে কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করে এবং তিলাওয়াত করা তার পক্ষে কঠিন ও কষ্টসাধ্য হয়, তার জন্য রয়েছে দুটি পুরস্কার। (সহিহ মুসলিম হাদিস নং: ১৭৪৭)
ইমাম নববি রাহি. বলেন, একটি পুরস্কার তিলাওয়াত করার জন্য, অপরটি তিলাওয়াত করতে গিয়ে কষ্টের সম্মুখীন হওয়ার দরুন।
তিলাওয়াতকারী অর্জন করবে আল্লাহর সামনে তিলাওয়াতের মহাসৌভাগ্য
কিয়ামতের দিন রব্বে কারিমের দরবারে কুরআনুল কারিম তার বাহকের বিশেষ সম্মাননার সুপারিশ নিয়ে হাজির হবে। তখন এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হবে। প্রখ্যাত সাহাবি হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বর্ণনায় সেই বিশেষ মুহূর্তটি এভাবে চিত্রায়িত হয়েছে:
عن أبي هريرة رضي الله عنه عن النبي ﷺ قالَ: «يَجِيءُ القُرْآنُ يَوْمَ القِيَامَةِ فَيَقُولُ: يَا رَبِّ حَلِّهِ فَيُلْبَسُ تَاجَ الكَرَامَةِ ثُمَّ يَقُولُ: يَا رَبِّ زِدْهُ فَيُلْبَسُ حُلَّةَ الكَرَامَةِ ثُمَّ يَقُولُ: يَا رَبِّ ارْضَ عَنْهُ، فَيُرْضَى عَنْهُ وَيُقَالُ لَهُ: اقْرَأْ وَارْتَقِ، وَيُزَادُ بِكُلِّ آيَةٍ حَسَنَةٌ
অর্থ: হযরত আবু হুরায়রা রাযি. হাতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কিয়ামতের দিন কুরআনুল কারিম উপস্থিত হয়ে আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিনের দরবারে সুপারিশ করে বলবে, হে আল্লাহ! একে (সম্মানের) অলংকার পরিধান করান। অতঃপর তাকে মর্যাদার মুকুট পড়ানো হবে। কুরআন পুনরায় বলবে হে প্রভু! তার ভূষণ আরো বাড়িয়ে দিন। অতঃপর তাকে মর্যাদার পোশাক পরিধান করানো হবে। আবারো কুরআন বলবে, হে আল্লাহ, তার প্রতি আপনি সন্তুষ্ট হয়ে যান। তখন আল্লাহ পাক রব্বুল আলামিন তার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন এবং তাকে বলবেন, তুমি তিলাওয়াত কর এবং উপরের দিকে উঠতে থাকো। আর প্রত্যেক আয়াতের বিনিময়ে তার একটি নেকি বা মর্যাদা বাড়ানো হবে। (তিরমিজি, হাদিস নং: ২৯১৫)
কিয়ামতের দিন কুরআন হবে তিলাওয়াতকারীর জন্য মহাসুপারিশকারী
একজন ইমানদার শুধুমাত্র তিলাওয়াতের মাধ্যমেও যদি কুরআনুল কারিমের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারে দুনিয়াতে তার জন্য রয়েছে সীমাহীন কল্যাণ আর আখিরাতে থাকবে অনন্য সম্মান ও মহাঅর্জন। প্রসিদ্ধ সাহাবি হযরত আবু উমামা বাহিলি রাযি. এর সূত্রে বর্ণিত:
سمعت رَسُولَ اللهِ ﷺ يقول : اقْرَؤُوا القُرْآنَ فَإِنَّهُ يَأْتِي يَوْمَ القِيَامَةِ شَفِيعًا لِأَصْحَابِهِ
অর্থ: (হযরত আবু উমামা বাহিলি রাযি. বলেন) আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি ইরশাদ করেন, তোমরা কুরআন তিলাওয়াত কর। কারণ কুরআন তার বাহকের জন্যতে কেয়ামতের দিন সুপারিশকারী হবে। (মুসলিম, হাদিস নং: ১৭৫৯)
তিলাওয়াতকারীকে কেয়ামতের মহাসংকট স্পর্শ করবে না
কেয়ামতের দিন মহাসংকটের মুহূর্তে যখন সকল শ্রেণীর মানুষ হিসাব-নিকাশ ও নানাবিধ পেরেশানিতে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে; তখনও কুরআনের বরকতে তার পাঠক থাকবে নিশ্চিন্তে।
বিখ্যাত সাহাবি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. এর সূত্রে বর্ণিত,
عن ابن عمر رضي الله عنهما قالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: «ثَلَاثَةٌ لَا يُهَوِّلُهُمُ الفَزَعُ الأَكْبَرُ وَلَا يَنَالُهُمُ الحِسَابُ وَهُمْ عَلَى كَثِيبٍ مِنْ مِسْكٍ حَتَّى يُفْرَغَ مِنْ حِسَابِ الخَلَائِقِ: رَجُلٌ قَرَأَ القُرْآنَ ابْتِغَاءَ وَجْهِ اللهِ
অর্থ: হযরত ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তিন শ্রেণির লোক যাদেরকে কেয়ামতের মহাসংকট স্পর্শ করবে না। তাদের থেকে কোনো ধরনের হিসাব গ্রহণ করা হবে না এবং মাখলুকের হিসাব গ্রহণ থেকে ফারেগ হওয়া পর্যন্ত তারা মিশক আম্বরের টিলায় অবস্থান করবে। (তাদের প্রথম শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হলো) ওই ব্যক্তি, যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করেছে। (আল মুজামুল খোলাসা লিত তাবরানি, হাদিস নং: ৯২৮০)
তিলাওয়াতের বরকতে ঘরবাড়ি থেকে দুষ্টু শয়তানের পলায়ন।
বর্তমান সময়ে ব্যাপক হারে ঘরবাড়িতে দুষ্টু শয়তানের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়। এবং তারা নারী-শিশুসহ ঘরের দুর্বল সদস্যদের ব্যাপকহারে আক্রান্ত করে থাকে। তাদের অনিষ্টতা থেকে মুক্তি পাওয়ার মহামন্ত্র হচ্ছে ঘরবাড়িতে সুরা বাকারার তিলাওয়াত। প্রখ্যাত সাহাবি হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর সূত্রে বর্ণিত হাদিস:
عن أبي هريرة رضي الله عنه قالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: «لَا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ مَقَابِرَ وَإِنَّ البَيْتَ الَّذِي تُقْرَأُ فِيهِ البَقَرَةُ لَا يَدْخُلُهُ الشَّيْطَانُ
অর্থ: হযরত আবু হুরায়রা রাযি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থানে পরিণত করো না। আর যেই ঘরে সুরা বাকারা তিলাওয়াত করা হয় সেখানে দুষ্টু শয়তান প্রবেশ করে না। (তিরমিজি হাদিস নং: ২৮৭৭)
অর্থাৎ তোমাদের ঘরবাড়িগুলো যেন কবরস্থানের ন্যায় বিরান তথা আমলশূন্য হয়ে না পড়ে; বরং আমলের মাধ্যমে তোমাদের ঘরবাড়িগুলোকে আবাদ এবং সজীব রাখো।
তিলাওয়াতকারী তিলাওয়াতের মাধ্যমে হয়ে উঠতে পারেন ইমানদারদের ঈর্ষার পাত্র
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযি. এর সূত্রে বর্ণিত হাদিস:
أن عَبدَ الله بنَ عمرو رضي الله عنه قالَ سمعت رَسُولَ اللهِ ﷺ يقول : «لَا حَسَدَ إِلَّا عَلَى اثْنَتَيْنِ: رَجُلٌ آتَاهُ اللهُ القُرْآنَ وقَامَ بِهِ آنَاءَ اللَّيْلِ.
অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযি. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, কেবল দুই ব্যক্তির ব্যাপারেই ঈর্ষা করা যেতে পারে। (প্রথম) ওই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন কিতাব তথা কুরআন তিলাওয়াতের যোগ্যতা দান করেছেন এবং সে রাতের একটি অংশে নামাজে দাঁড়িয়ে তা পাঠ করে। (বুখারি, হাদিস নং: ৫০২৫)
অন্যের কাছ থেকে কুরআনুল কারিমের তিলাওয়াত শোনাও ইবাদত
নিজে কুরআনুল কারিমের তিলাওয়াত করা যেমন মহাপুণ্যের কাজ, মাঝেমধ্যে অন্যের তিলাওয়াত শোনাও ইবাদত। এতে মুমিনের ইমান বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুমধুর তিলাওয়াত মনোযোগসহ শুনতেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও সাহাবায়ে কেরাম থেকে তিলাওয়াত শুনতেন। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন কর্তৃক প্রিয় হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তিলাওয়াত শ্রবনের বিষয়টি হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর বর্ণনাকৃত হাদিসে এভাবে ফুটে উঠেছে,
عَنْ أبي هريرة رضي الله عنه أنه كان يقول قالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: لَمْ يَأْذَن اللهُ لِشَيْءٍ مَا أَذِنَ لِلنَّبِيِّ أَنْ يَتَغَنَّى بِالقُرْآنِ
অর্থ: হযরত আবু হুরায়রা রাযি থেকে বর্ণিত, তিনি বলতেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন কোন জিনিস এরূপ কান লাগিয়ে শোনেন না যেরূপ তিনি নবির সুমধুর সুরে করা কুরআন তিলাওয়াত মনোযোগ সহকারে শোনেন। (বুখারি, হাদিস নং: ৫০২৩)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও অনেকসময় সাহাবিদের তিলাওয়াত শুনতেন। এখানে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু থেকে তিলাওয়াত শ্রবণের ঘটনাটি বর্ণনা করা হলো:
عن عبدِ الله بْنِ مسعود رضي الله عنه قالَ لِي رَسُولُ اللهِ ﷺ: «اقْرَأْ عَلَيَّ قال قُلْتُ: أَأَقْرَأُ عَلَيْكَ وَعَلَيْكَ أُنْزِلَ؟ قَالَ: «إِنِّي أَشْتَهِي أَنْ أَسْمَعَهُ مِنْ غَيْرِي قَالَ: فَقَرَأْتُ النِّسَاءَ حَتَّى بَلَغْتُ: ﴿ فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ، وَجِئْنَا بِكَ عَلَىٰ هَؤُلَاءِ شَهِيدًا ﴾ فَقَالَ لِي: كُفَّ أو أمسك فَإِذَا رأيت عينيه تَذْرِفَانِ
অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. বলেন আমাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমাকে তিলাওয়াত করে শোনাও। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম, আমি আপনাকে তিলাওয়াত করে শোনাবো, অথচ কুরআন তো আপনার উপর নাযিল হয়েছে? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি অন্যের কাছ থেকে তিলাওয়াত শোনা পছন্দ করি। সুতরাং আমি সুরা নিসা তিলাওয়াত করলাম যখন আমি (তখন তাদের কি অবস্থা হবে যখন আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যথেকে একজন সাক্ষী আনব এবং তোমাকে তাদের উপরে সাক্ষী হিসেবে পেশ করব?) পর্যন্ত তিলাওয়াত করলাম, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন থাম। অথবা তিনি বললেন, তোমার তিলাওয়াত বন্ধ কর। তখন আমি লক্ষ্য করলাম যে, তাঁর দু’চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছে। (বুখারী, হাদিস নং: ৫০৫৫)
ইসলামের চিহ্নিত শত্রুদেরও মুগ্ধ করত পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াত
পবিত্র কুরআনুল কারিম যেহেতু সর্বজনীন। তাই এর তিলাওয়াতের অপার্থিব মাধুর্যে বিমোহিত হয় মুসলিম-অমুসলিম সকলে, নির্বিশেষে। ইসলাম ও কুরআনের চরম দুশমন, যারা ইসলাম ও কুরআনের আলো চিরতরে নিভিয়ে দেয়ার নানাবিদ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকতো, তারাও তিলাওয়াতের মধুর টানে আকর্ষণ অনুভব করত এবং তা শ্রবণ করতে ব্যাকুল হয়ে যেত। মক্কার চিহ্নিত মুশরিক লিডাররা, যারা দ্বীনের পথে বাধা সৃষ্টির লক্ষ্যে অধীনস্থদের নির্দেশ দিত কুরআনুল কারিমের তিলাওয়াতের সময় হট্টগোল করার; রাতের আঁধারে তারাই সাধারণ জনগণের চোখ ফাঁকি দিয়ে গোপনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জবান থেকে সুমধুর তিলাওয়াত শুনতে তাঁর গৃহের পাশে কান পেতে বসে পড়তো। কুরআনের চিরশত্রু আবু জাহেল, আবু সুফিয়ান এবং আহনাফ ইবনে শরিক গোপনে রাতের আঁধারে স্বতন্ত্রভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরের কোণে বসে সারারাত তিলাওয়াত শোনা এবং ফেরার পথে পরপর তিন রাতে প্রত্যেকের কাছে প্রত্যেকের ধরা খেয়ে যাওয়া এবং প্রতিবার নিজেরা নিজেদের ভর্ৎসনা করে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার ইতিহাস তো প্রসিদ্ধ। আরবের প্রসিদ্ধ বাকপটু বিচক্ষণ নেতা উতবা ইবনে রাবিয়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে তাঁকে দীন প্রচারের মিশন থেকে বিরত থাকার জন্য কিছু প্রস্তাবনা এবং কিছু লোভনীয় অফার পেশ করা এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক তাকে কালামে পাকের সুরা হা-মীম সাজদা থেকে কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শোনানো, এতে তার মুগ্ধতা এবং সেখান থেকে ফিরে গিয়ে অন্যান্য কাফের নেতাদের নিকট দেওয়া তার চিরসত্য স্বীকারোক্তি ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। উতবা বলেছিল, আল্লাহর কসম! আমি মুহাম্মদের কাছ থেকে যে বাণী শুনে এলাম, জীবনে কখনো এ ধরনের জ্ঞানগর্ভ বাণী শুনিনি। প্রভুর শপথ! তা কোনো কবিতা মন্ত্র বা জাদু নয়, নয় কোনো গণকের কাল্পনিক কাহিনীমালা। হে কুরাইশ! আমার পরামর্শ হচ্ছে তোমরা তাঁকে (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে) তাঁর মত ছেড়ে দাও। কারণ আমি তার কাছ থেকে এমন মহামূল্যবান বাণী শুনে এসেছি যার মধ্যে মহাসংবাদ রয়েছে। অযথা তার পিছনে পড়ো না। এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর হবে। (তাফসীরে ইবনে কসীর: ৭/১৪৮)
তিলাওয়াতকারী আর গাইরে তিলাওয়াতকারীর দৃষ্টান্ত :
বিশিষ্ট সাহাবি হযরত আবু মুসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সূত্রে বর্ণিত হাদিসে যে তিলাওয়াত করে এবং যে তিলাওয়াত করে না, উভয়ের দৃষ্টান্ত এভাবে বিবৃত হয়েছে:
عَنْ أَبِي مُوسَى الأَشْعَرِيِّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ: مَثَلُ المُؤْمِنِ الَّذِي يَقْرَأُ القُرْآنَ كَالأُتْرُجَّةِ، طَعْمُهَا طَيِّبٌ وَرِيحُهَا طَيِّبٌ وَمَثَلُ المُؤْمِنِ الَّذِي لَا يَقْرَأُ القُرْآنَ كَالتَّمْرَةِ، طَعْمُهَا طَيِّبٌ وَلَا رِيحَ لَهَا وَمَثَلُ المُنَافِقِ الَّذِي يَقْرَأُ القُرْآنَ كَالرَّيْحَانَةِ، رِيحُهَا طَيِّبٌ وَطَعْمُهَا مُرٌّ وَمَثَلُ المُنَافِقِ الَّذِي لَا يَقْرَأُ القُرْآنَ كَالْحَنْظَلَةِ، طَعْمُهَا مُرٌّ وَلَا رِيحَ لَهَا
অর্থ: হযরত আবু মুসা আশআরি রাযি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে (নেককার) ব্যক্তি কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করে তার দৃষ্টান্ত হলো ঐ লেবুর মতো যা সুস্বাদু এবং তার ঘ্রাণও উৎকৃষ্ট। আর যে (নেককার) কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করে না তার দৃষ্টান্ত হলো খেজুরের মতো, তা খেতে সুমিষ্ট তবে তাতে ঘ্রাণ নেই। আর যে পাপী কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করে তার দৃষ্টান্ত রায়হান ফুলের মতো, যাতে রয়েছে অত্যন্ত সুঘ্রাণ, কিন্তু তার স্বাদ তিক্ত। আর যে পাপী কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করে না তার দৃষ্টান্ত মাকাল ফলের ন্যায়, যা খেতে তিক্ত এবং তার কোন ঘ্রাণও নেই। (বুখারী, হাদিস নং : ৫০২০)
হাদিস দ্বারা বোঝা গেল, কুরআনুল কারিমের তিলাওয়াত নেককার ও পাপাচার সকল শ্রেণীর মুসলমানের জন্যই উপকারী ও সফলতার মাধ্যম।
তিলাওয়াত করতে হবে সুস্পষ্টভাবে এবং সুরেলা কণ্ঠে
তিলাওয়াতকারীর উচিত কুরআন পাঠের সময় তাড়াহুড়া না করে ধীরগতিতে তাদাব্বুর তথা ধ্যানের সাথে সাধ্যানুযায়ী সুরেলা কণ্ঠে তিলাওয়াত করা। কারণ আল্লাহর কালাম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে সুরেলা কণ্ঠে পাঠ করতেন এবং উম্মতকেও সুরেলা কণ্ঠে তিলাওয়াতের প্রতি তাগিদ করেছেন। হযরত আবু হুরায়রা রাযি. এর বর্ণনায় এসেছে,
عن أبي هريرةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قالَ قالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَتَغَنَّ بِالقُرْآنِ
অর্থ: হযরত আবু হুরায়রা রাযি. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কুরআনুল কারিম মধুর স্বরে সুন্দর করে তিলাওয়াত করে না সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। (বুখারী, হাদিস নং: ৭০৮৯)
উদাসীনতার সাথে নয়; তিলাওয়াত করতে হবে পূর্ণ মনোযোগী হয়ে
মহান রাব্বুল আলামিন যেমন শ্রেষ্ঠ তাঁর কালামও শ্রেষ্ঠ। তাঁর পবিত্র কালাম পাঠ করা উচিত পূর্ণ মনোযোগী ও আগ্রহী হয়ে। মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটলে কিংবা উদাসীনতার ভাব চলে এলে তৎক্ষণাৎ তিলাওয়াত বন্ধ করে দেয়া উচিত। কারণ, বেখেয়ালী হয়ে কুরআন পাঠ করা কুরআনের সাথে বেয়াদবির নামান্তর। একজন মুমিন কখন তিলাওয়াত করবে আর কখন তিলাওয়াত পরিহার করবে, এক্ষেত্রে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকনির্দেশনা নিম্নরূপ:
عن جُندُبِ بنِ عبدِ الله عنِ النبي ﷺ قالَ: اقْرَؤُوا القُرْآنَ مَا ائْتَلَفَتْ قُلُوبُكُمْ فَإِذَا اخْتَلَفْتُمْ فَقُومُوا عَنْهُ
অর্থ: হযরত জুন্দুব ইবনে আব্দুল্লাহ রাযি. এর সূত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যতক্ষণ মনের চাহিদা থাকে তোমরা কুরআন তিলাওয়াত করতে থাক। সুতরাং, যখন মনোসংযোগের অভাব দেখা দেয় তখন তিলাওয়াত পরিহার করো। (বুখারি, হাদিস নং: ৫০৬০)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে তিলাওয়াত
কুরআনের সাথে ছিল প্রিয় হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আত্মার নিবিড় সম্পর্ক। দিবানিশি তিনি কুরআন নিয়ে থাকাতেই খুঁজে পেতেন জীবনের সজীবতা ও স্বার্থকতা। দিনভর ধারাবাহিক দাওয়াতি কার্যক্রমের ফাঁকে যতটুকু সম্ভব তিলাওয়াত করে নিতেন আর রাতের আঁধারে নির্জনে নিভৃতে বিরামহীন দাঁড়িয়ে তিলাওয়াত করা তাঁর প্রিয় অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। কখনো অর্ধ রাত আবার কখনো বা পূর্ণ রাত নামাজে দাঁড়িয়ে তেলাওয়াতে কাটিয়ে দিতেন। পূর্বাপরের সকল গুনাহ মাফ হওয়া সত্ত্বেও বিরামহীন দীর্ঘসময় নামাজে দাঁড়িয়ে তিলাওয়াত করার ফলে তাঁর পা মুবারক ফুলেও যেত। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার ফলে তাঁর পা মোবারক ফুলে যাওয়ার বিষয়টি প্রখ্যাত সাহাবি হযরত মুগিরা ইবনে শুবা রাযি এর বর্ণনায় এভাবে চিত্রায়িত হয়েছে,
عن المغيرة بن شعبة رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قالَ: صَلَّى رَسُولُ اللهِ ﷺ حَتَّى انْتَفَخَتْ قَدَمَاهُ فَقِيلَ لَهُ: أَتَتَكَلَّفُ هَذَا وَقَدْ غُفِرَ لَكَ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ؟ قَالَ: أَفَلَا أَكُونُ عَبْدًا شَكُورًا
অর্থ: হযরত মুগিরা ইবনে শুবা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (রাতের তাহাজ্জুদে) এই পরিমাণ লম্বা নামাজ পড়তেন যে তার পা মোবারক ফুলে যেত।সুতরাং সাহাবায়ে কেরাম তাঁকে জিজ্ঞেস করল আপনি এত কষ্ট করেন অথচ আপনার পূর্বপরের সকল গুনাহ মাফ? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি কি কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী বান্দা হব না? (তিরমিজি, হাদিস নং: ৪২২)
আমরা জানি নবিগণ মাসুম, তবে বিশেষ মর্যাদা বা উদ্দেশ্যে আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন শুধু রাসুলের পূর্ব পরের গুনাহ মাফের এলান করেছেন। আর রাসুল উক্ত ঘোষণা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবাদতের পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তাঁর স্বতন্ত্র নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের নিমিত্তে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি রমজান মাসে হযরত জিব্রাইল আলাইহিস সাল্লামকে পূর্ণ কুরআন পাঠ করে শোনাতেন। (বুখারি, হাদিস নং: ৪৯৯৭)
এছাড়াও তিনি সফর অবস্থায় বাহনে বসে তিলাওয়াত করতেন।
সাহাবায়ে কেরামের জীবনে কুরআন তিলাওয়াত
নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে কুরআনুল কারিমের সবচেয়ে বড় আশিক ছিলেন সাহাবায়ে কেরাম। দিনের আলোতে, রাতের আঁধারে, ঘরের কোণে, মসজিদের ভেতরে, একাকী নির্জনে কিংবা জামাতবদ্ধভাবে তিলাওয়াত করা ছিল তাঁদের নিত্যদিনের অভ্যাস। জিহাদের ময়দান থেকে ফেরার পথে রাতের কোনো এক প্রহরে সামান্য একটু বিশ্রামের সুযোগ পেয়েছেন, তখনও মশগুল হয়ে পড়েছেন পবিত্র কালাম পাঠে। স্বাভাবিক অবস্থায় সাহাবায়ে কেরাম রাযি. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায় রাতের আঁধারে নির্জনে নিভৃতে প্রভুর দরবারে দাঁড়িয়ে নামাজ রত অবস্থায় তিলাওয়াত করাকে খুব পছন্দ করতেন আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাঝে মাঝে তাঁর প্রিয় সাহাবিদের রাতের আঁধারে নামাজে দাঁড়িয়ে করা তিলাওয়াত শ্রবণ করে মুগ্ধ হতেন। এ বিষয়টি হযরত আবু কাতাদা রাযিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর সূত্রে বর্ণিত হাদিসে এভাবে ফুটে উঠেছে:
عَنْ أبي قَتَادةَ أنَّ النَّبِيَّ ﷺ خَرَجَ لَيْلَةً، فَإِذَا هُوَ بِأَبِي بَكْرٍ يُصَلِّي يُخَفِّضُ صَوْتَهُ وَمَرَّ بِعُمَرَ وَهُوَ يُصَلِّي رَافِعًا صَوْتَه فلما اجتمعا عند النبي ﷺ قال النبي ﷺ لِأَبِي بَكْرٍ: «مرَرْتُ بِكَ وَأَنْتَ تُخَفِّضُ صَوْتَكَ قَالَ: قَدْ أَسْمَعْتُ مَنْ نَاجَيْتُ يَا رَسُولَ اللهِ. وَقَالَ لِعُمَرَ: «مرَرْتُ بِكَ وَأَنْتَ تَرْفَعُ صَوْتَكَ قَالَ: أُوقِظُ الوَسْنَانَ وَأَطْرُدُ الشَّيْطَانَ. فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ: يَا أَبَا بَكْرٍ، ارْفَعْ مِنْ صَوْتِكَ شَيْئًا وَقَالَ لِعُمَرَ: «اخْفِضْ مِنْ صَوْتِكَ شَيْئًا
অর্থ: হযরত আবু কাতাদা রাযি. এর সূত্রে বর্ণিত, নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক রাতে বের হয়ে দেখেন আবু বকর রাযি. হালকা আওয়াজে নামাজে তিলাওয়াত করছেন। উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় শুনতে পেলেন তিনি উচ্চ আওয়াজে নামাজে তিলাওয়াত করছিলেন। অতঃপর যখন তাঁরা উভয়ে নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মজলিসে একত্রিত হলেন, নবিজি বললেন, হে আবু বকর! তোমার পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছি এমতাবস্থায় যে তুমি হালকা ওয়াজে নামাজে তিলাওয়াত করছিলে। তিনি বললেন ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি তো শোনাই ওই সত্তাকে যার সাথে আমার গোপনে আলাপ। আর তিনি উমর রাযি. কে বললেন, তোমার পাশ দিয়ে যখন অতিক্রম করেছি, তখন তুমি উচ্চ আওয়াজে নামাজে তিলাওয়াত করছিলে। তিনি বলেন ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি তো আমার তিলাওয়াতের মাধ্যমে ঘুমন্তদেরকে জাগাই এবং শয়তানকে তাড়াই। হাসান রাহিমাহুল্লাহ তার হাদিসের মধ্যে অতিরিক্ত উল্লেখ করেছেন, তখন নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আবু বকর! তুমি আরেকটু উচ্চস্বরে পাঠ করবে। আর উমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুকে বলেছেন, তুমি তেলাওয়াতে আওয়াজকে আরেকটু নিচু করবে। (আবু দাউদ, হাদিস নং: ১৩২৯)
সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুমধুর কণ্ঠস্বরের অধিকারী সাহাবি হযরত আবু মুসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর রাতের তেলাওয়াতে মুগ্ধ হয়ে রাসুল সাঃ তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
لَوْ رَأَيْتَنِي وَأَنَا أَسْتَمِعُ لِقِرَاءَتِكَ البَارِحَةَ لَقَدْ أُوتِيتُ مِنْ مَزَامِيرِ آلِ دَاوُودَ
অর্থ, (রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন) গতরাতে যখন আমি তোমার কুরআন পাঠ শুনছিলাম তখন যদি তুমি আমাকে দেখতে! তোমাকে তো দাউদ আ. এর মত সুমিষ্ট কন্ঠ দেয়া হয়েছে। (মুসলিম, হাদিস: ১৭৩৭)
অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরাম রাযি. সাত দিনে পূর্ণ কুরআন খতম করতেন। কোনো কোনো সাহাবি মাত্র তিন দিনে, কেউ মাত্র একদিনে; এমনকি কুরআনপ্রেমী এমন সাহাবিও ছিলেন যিনি এক রাকাতে পূর্ণ কুরআন কারিম খতম করতেন। ইমাম ইবনুল জাউযি রাহ. তার বিখ্যাত কিতাব সিফাতুস সাফওয়ায় হযরত উসমান রাযি. এর জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে আল্লামা ইবনে সিরিন রাহ. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, খারেজিরা যখন হযরত উসমান রাযি. কে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল, তখন উসমান রাযি. এর স্ত্রী দুষ্কৃতিকারীদের উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, তোমরা তাঁকে হত্যা করো কিংবা ছেড়ে দাও এটা তোমাদের ব্যাপার! তবে তোমরা তার ব্যাপারে একটি বিষয় জেনে নাও! তিনি এক রাকাতে পূর্ণ কুরআনুল কারিম খতমে অভ্যস্ত একজন মানুষ। এবং তিনি সারারাত নামাজে কাটান। (সিফাতুস সাফওয়া ১/২০০, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ২/৫০২)
ইমাম তাহাবি রহ. হযরত ওসমান রাযি., হযরত তামিম দারি রাযি. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর রাযি. এবং হযরত সাঈদ ইবনে যুবায়ের রাযি. সম্পর্কে শরহু মায়ানিল আসারে উল্লেখ করেছেন যে, তারা সকলেই এক রাতে সম্পূর্ণ কুরআন খতম করতেন। (শরহু মায়ানিল আসার খন্ড ১: পৃষ্ঠা ৩২৩) (আততিবয়ান: পৃষ্ঠা ৬০)
কুরআনুল কারিমের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা একশ্রেণীর মানুষকে সম্মানিত করেন :
পবিত্র কুরআনুল কারিম এর সাথে যাদের মধুর সম্পর্ক এবং যারা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কুরআনকে প্রাধান্য দেয় আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন তাদেরকে এর বদৌলতে দুনিয়াতেও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেন। হযরত উমর রাযি. এর জামানার একটি ঘটনার মাধ্যমে তা এভাবে ফুটে উঠেছে,
হযরত নাফে ইবনে আব্দুল হারিস রা. উসফান নামক স্থানে হযরত উমর রাযি. এর সাথে সাক্ষাৎ করলে হযরত উমর তাকে মক্কার রাজস্ব আদায়কারী হিসেবে নিয়োগ দেন। পরে তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, মক্কার প্রান্তরবাসীদের জন্য কাকে নিয়োগ দিতে চাও? হযরত নাফে রা. বলেন, ইবনে আবযাকে। হযরত উমর বলেন, ইবনে আবযা কে? নাফে রা. বলেন, সে আমাদের আজাদকৃত একজন ক্রীতদাস। হযরত উমর রাযি. বলেন, একজন ক্রীতদাসকে তাদের জিম্মাদার বানানোর কারণ কি? উত্তরে হযরত নাফে বলেন, সে কুরআনের একজন ভালো ক্বারী এবং ফারায়েজ শাস্ত্রেও তার ভালো জানাশোনা রয়েছে। এই কথা শুনে হযরত উমর বলেন, তোমাদের নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঠিকই বলেছেন, “আল্লাহ তাআলা এ কুরআনের মাধ্যমে এক শ্রেণীর লোককে মর্যাদার আসনে অধিষ্ট করেন আর এক শ্রেণীর লোককে এর মাধ্যমেই লাঞ্ছিত করেন” । (মুসলিম হাদিস নং: ১৭৮২)
প্রিয় পাঠক! কুরআন যেন হয় আমাদের হৃদয়ের বসন্ত এবং তা যেন হয় আমাদের ভালোলাগা ও ভালোবাসার পাত্র। এটা আমাদের মহান প্রভুর মহিমান্বিত কালাম। একে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। নিয়মিত তা পাঠ করতে হবে পূর্ণ ভক্তি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে। তাহলেই আমরা দুনিয়া ও আখিরাতের মহাকল্যাণ অর্জনে সক্ষম হব। আমাদের জীবন হবে স্বার্থক, ইনশা আল্লাহ ।
সহিহ হাদিস ও আসারের আলোকে ইসরা ও মেরাজ মুফতি আবদুল কাইয়ুম