বর্ষ: ১, সংখ্যা: ১
রজব, শাবান, রমজান - ১৪৪৭ | ডিসেম্বর - ২০২৫, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি - ২০২৬
রোজার গুরুত্ব ও ফজিলত মুফতি হাবিবুর রহমান আজমি (রহ.)
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ ও সর্বাঙ্গীণ শরিয়ত যার ভেতরে বিভিন্ন ধরনের ইবাদত রয়েছে। এর মধ্যে কিছু ইবাদতের সম্পর্ক কথার সঙ্গে যেমন : জিকির, দোয়া, ভালো কাজের দিকে আহ্বান, ওয়াজ ও নসীহত, শিক্ষা ও শিক্ষাদান ইত্যাদি। আবার কিছু ইবাদতের সম্পর্ক কাজের সঙ্গে, সেগুলো হতে পারে শারীরিক যেমন- নামজ। কিংবা আর্থিক যেমন- যাকাত ও সদকা অথবা একই সঙ্গে শারীরিক ও আর্থিক যেমন- হজ ও আল্লাহর পথে জিহাদ। আর কিছু ইবাদত এমন রয়েছে যেগুলো না কথার সঙ্গে সম্পর্কিত, না সরাসরি কাজের সঙ্গে; বরং সেগুলোর মধ্যে শুধু বিরত থাকাই মূল বিষয় যেমন- রোজা।
(যদিও অধিকাংশ আলেম রোজাকে শারীরিক ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এটাই অধিক সঠিক মত; কারণ কোনো কিছু থেকে বিরত থাকাও আসলে একটি কাজ ও আমল হিসেবেই গণ্য হয়।)
রোজার প্রকৃত বাস্তবতা
ইবাদতের নিয়ত নিয়ে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাবার, পানীয় ও সহবাস থেকে বিরত থাকার নাম রোজা। এই ইবাদত ইসলাম পূর্ব অন্যান্য ধর্মেও গুণগত ও পরিমাণগত ভিন্নতার সঙ্গে প্রচলিত ছিল। যেমনটি কুরআন নিজেই সাক্ষ্য দিচ্ছে:
یَا اَیُّھَا الذِیْنَ آمَنُوا کُتِبَ عَلَیْکُمُ الصِّیَامُ کَمَا کُتِبَ عَلَی الَّذِیْنَ مِنْ قَبْلِکُمْ لَعَلَّکُمْ تَتَّقُوْنَ
“হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো”। (সুরা আল-বাকারা, আয়াত : ১৮৩)
কিন্তু ইসলাম যেভাবে নামায ও যাকাতে সর্বাঙ্গীনতা ও কেন্দ্রিকতা এনে সেগুলোকে অন্যান্য ধর্মের নামায ও যাকাত থেকে স্বতন্ত্র ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে, ঠিক তেমনি রোজাকেও অন্যান্য ধর্মের রোজা থেকে বিশেষ মর্যাদা ও স্বাতন্ত্র্য দান করেছে। সে উদ্দেশ্যে ফরজ রোজাকে একটি নির্দিষ্ট মাসের সঙ্গে নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর সেই মাসকেই নির্বাচিত করা হয়েছে, যে মাসে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের জন্য হেদায়েতের সংবিধান অর্থাৎ কুরআন নাযিল করেছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
شَھْرُ رَمَضَانَ الَّذِیْ اُنْزِلَ فِیْہِ الْقُرْآنُ ھُدَی لِّلنَّاسِ وَبَیِّنَاتٍ مِنَ الْھُدَیٰ وَالفُرْقَانِ فَمَنْ شَھِدَ مِنْکُمْ الشَّھْرَ فَلْیَصُمْہُ
রমজান সেই মাস যাতে কুরআন নাজিল করা হয়েছে যা মানুষের জন্য হেদায়েত, হেদায়েতের সুস্পষ্ট নিদর্শন এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী। অতএব তোমাদের মধ্যে যে কেউ এই মাস পাবে সে অবশ্যই এতে রোজা পালন করবে। (সুরা আল-বাকারা, আয়াত : ১৮৫)
রোজার কল্যাণ ও হিকমতসমূহ
(১) আমাদের পরিপূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে যে, রোজা ফরজ হওয়ার মধ্যে অসংখ্য হিকমত ও কল্যাণ নিহিত আছে; যদিও আমাদের সীমিত বুদ্ধি সেসব গোপন রহস্য, হিকমত ও কল্যাণের সবটুকু পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম নয়। তবে যেগুলো আমাদের বোধগম্য হচ্ছে, তার কিছু এখানে তুলে ধরা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে সর্বপ্রথম আমাদের নিজেদের অস্তিত্বের দিকে গভীরভাবে লক্ষ্য করা উচিত। মানুষের প্রকৃত বাস্তবতা কী? মানুষ কি শুধু এই বাহ্যিক দেহ মাংস, চামড়া ও হাড়ের একটি সমষ্টিমাত্র? নাকি এই বাহ্যিক গঠনের বাইরে তার আরেকটি বাস্তব সত্তা রয়েছে? স্পষ্ট যে, কেবল এই বাহ্যিক দেহকেই মানুষ বলা যায় না। নইলে মানুষের চেয়ে নিকৃষ্ট ও তুচ্ছ সৃষ্টি আর কিছুই থাকত না। অথচ মানুষ হলো সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ ও সৃষ্টিজগতের সারসত্তা। সুতরাং মানতেই হবে, মানুষ কেবল বাহ্যিক রূপের নাম নয়; বরং সে এমন এক বাস্তবতার নাম যার কারণে সে সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে স্বতন্ত্র মর্যাদা লাভ করেছে।
প্রশ্ন দাঁড়ায়, সেই জিনিসটি কী, যার মাধ্যমে মানুষের মানবসত্তা বাস্তবায়িত হয়? যখন আমরা মানুষের নফস বা অন্তরের ওপর চিন্তা করি, তখন পরিষ্কার হয়ে যায়, প্রকৃতপক্ষে মানুষ এক রুহানি সত্তার নাম। আল্লাহ তাআলা তাঁর পরিপূর্ণ হিকমতের মাধ্যমে এর মধ্যে চিন্তা ও উপলব্ধির এমন যোগ্যতা ও ক্ষমতা সৃষ্টি করেছেন, যার দ্বারা মানুষ কেবল বোঝে না বরং গোটা জগতের উপর কর্তৃত্ব করে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই মানুষ ফেরেশতাদের সেজদার উপযুক্ত হয়েছে। কুরআন মাজীদ এ সত্যকে এভাবে বর্ণনা করেছে:
اِذْ قَالَ رَبُّکَ لِلملائکةِ اِنِّیْ خَالِقٌ بشرًا مِنْ طِیْنٍ فَاِذَا سَوَّیْتُہُ وَنَفَخْتُ فِیْہ مِنْ رُوْحِیْ فَقَعُوا لَہُ سَاجِدِین․
স্মরণ করো, যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদের বললেন ‘আমি মাটি থেকে একজন মানুষ সৃষ্টি করতে যাচ্ছি। অতঃপর যখন তাকে পূর্ণাঙ্গ করে দেব এবং তার মধ্যে আমার রূহ ফুঁকে দেব, তখন তোমরা সবাই তার সামনে সেজদায় লুটিয়ে পড়বে।’ (সুরা সাদ আয়াত ৭১-৭২)
যেহেতু নফসের কামনাকে দমন করার মাধ্যমে রুহানি শক্তি বৃদ্ধি পায় আর রোজার মাধ্যমে পেট ও যৌন কামনার ওপর আঘাত হানা হয়; অতএব স্বাভাবিকভাবে রুহানিয়ত শক্তিশালী হয়। আর যেহেতু এই রুহানি সত্তার কারণেই একজন মানুষের নাম ‘মানুষ’ তাই বলা যায়, রোজার মাধ্যমেই মানুষের প্রকৃত মানবতা গঠিত ও পরিপূর্ণ হয়।
(২) রোজার দ্বারা যেমন আত্মা শক্তি লাভ করে, তেমনি দেহেরও সংস্কার ও সংশোধন হয়। কারণ অধিকাংশ রোগের উৎপত্তি হয় পাকস্থলীর ব্যাধি থেকে। প্রবাদ রয়েছে, পাকস্থলী সব রোগের মূল। নবি কারিম ﷺ এক হদিসে ইরশাদ করেছেন: مَا مَلَأَ آدَمِيٌّ وِعَاءً شَرًّا مِن بَطْنه “মানুষ নিজের পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো পাত্র ভরে না।” (তিরমিজি, হাদিস নম্বর: ২৩৮০)
অতএব যখন পেট ভরে খাওয়াই রোগ-ব্যাধির সূচনা তখন তার চিকিৎসা হলো পেটকে খালি রাখা। আর রোজার মধ্যে এটাই ঘটে। পেট খালি রাখা হয়। ফলে দেহের সংশোধন হয় এবং মানুষ বহু রোগ থেকে নিরাপদ থাকে।
(৩) রোজার আরেকটি বড় উপকার হলো, এর দ্বারা মানুষের মধ্যে সবর ও দৃঢ়তার গুণ সৃষ্টি হয়, যা মানুষের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান গুণ। রোজাদারের সামনে সুস্বাদু ও পছন্দের খাবার এবং শীতল মিষ্টি পানি উপস্থিত থাকে, তবুও সে সেদিকে চোখ তুলে তাকায় না। অথচ বাহ্যত এসব ভোগ করার ক্ষেত্রে তার কোনো বাধা নেই। কিন্তু তার বিবেক তাকে অনুমতি দেয় না যে, নিজের রোজা নষ্ট করে সে আল্লাহর গজবের যোগ্য হবে। এক মাসব্যাপী এই অনুশীলন অবধারিতভাবে মানুষের মধ্যে দৃঢ়তা ও অবিচলতার ক্ষমতা সৃষ্টি করে। সে কারণেই মনোবিজ্ঞানীরা তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে বলেছেন রোজার মতো দৃঢ় সংকল্প ও অটল ইচ্ছাশক্তি গড়ে তোলার আর কোনো উপায় নেই।
নবি কারিম ﷺ তাই বিশেষভাবে যুবকদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন :
یَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْکُمُ البَاءَةَ فَلْیَتَزَوَّجْ فَاِنَّہ اَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأحْصَنُ لِلْفَرَجِ وَمَنْ لَمْ یَسْتَطِعْ فَعَلیہِ بِالصَّومِ فَاِنَّہ لَہ وِجَاءٌ․
হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে সে যেন অবশ্যই বিয়ে করে। কেননা বিয়ে দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে নিরাপদ রাখে। আর যে বিয়ে করতে সক্ষম নয়, সে যেন রোজা রাখে কারণ রোজা তার জন্য ঢালস্বরূপ। (সাহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০৬৫)
আর এক স্থানে এ বিষয়টি এভাবে বর্ণিত হয়েছে:
لِکُلّ شیءٍ زکوٰةٌ وَزَکوٰةُ الجَسَدِ الصومُ، والصومُ نِصْفُ الصَبْرِ
প্রত্যেক জিনিসের যাকাত আছে আর দেহের যাকাত হলো রোজা। আর রোজা হলো অর্ধেক সবর। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ১৭৪৫)
এই হাদীসে রোজাকে ‘অর্ধেক সবর’ বলা হয়েছে এজন্য যে, মানুষের মধ্যে তিনটি শক্তি রয়েছে একটি যৌন ও প্রবৃত্তির শক্তি, দ্বিতীয়টি রাগ ও ক্রোধের শক্তি এবং তৃতীয়টি রুহানি শক্তি। রোজার মাধ্যমে মানুষ তার যৌন ও প্রবৃত্তির শক্তির উপর বিজয় লাভ করে। ফলে সে যেন অর্ধেক সবরের অধিকারী হয়ে যায়।
(৪) ইসলাম কেবল নাম-পরিচয় ও আচার-অনুষ্ঠানের ধর্ম নয় বরং এটি জিহাদের দ্বীন। আর জিহাদের জন্য সবর ও দৃঢ়তা অপরিহার্য। যে ব্যক্তি নিজের নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে পারে না সে শত্রুর মোকাবিলা কীভাবে করবে? আর যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না সে শত্রুকে পরাস্ত করবে কীভাবে? যে এক দিনের ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করতে পারে না সে ঘরবাড়ি ছেড়ে দেওয়ার কষ্ট কীভাবে সহ্য করবে? তাই বছরে এক মাস রোজা ফরজ করে মানুষের মধ্যে সবর ও স্থিরতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় যাতে সে জিহাদের জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠে।
(৫) রোজার আরেকটি বড় উপকার হলো এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার দেয়া নিয়ামতগুলোর আসল মূল্য ও মর্যাদা হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। কারণ বস্তুসমূহ তাদের বিপরীতের মাধ্যমেই চেনা যায়। যতক্ষণ মানুষ ক্ষুধা ও তৃষ্ণার তীব্রতা অনুভব না করবে ততক্ষণ খাবার-পানীয়ের প্রকৃত মূল্যও বুঝবেনা। আর যখন সে এই নিয়ামতগুলোর মর্যাদা উপলব্ধি করবে তখন সেগুলোর যথাযথ কদর আদায়ের চেষ্টা করবে। এভাবে রোজা মানুষকে আল্লাহর শোকর ও ইবাদতে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে শক্তিশালী প্রভাব ফেলে। সে কারণেই আমাদের প্রিয় নবি ﷺ দারিদ্র্যকে প্রাচুর্যের ওপর প্রাধান্য দিতেন। এক হাদীসে এসেছে:
عَرَضَ عَلیَّ رَبِّی لِیَجْعَلَ لِیْ بَطْحَاءَ مکةَ ذَھَبًا قُلْتُ لاَ یَارَبِّ وَلٰکِنْ اَشْبَعُ یَوْمًا وَاَجُوعُ یومًا فَاذَا جِعْتُ تَضَرَّعْتُ الَیْکَ وذکرتُ واذَا شَبِعْتُ شَکَرْتُکَ وَحَمِدْتُکَ
আমার প্রতিপালক আমার কাছে প্রস্তাব করেছিলেন মক্কার প্রান্তরগুলো আমার জন্য সোনায় পরিণত করে দিতে। আমি বললাম: হে আমার রব! আমার এর প্রয়োজন নেই; বরং আমি চাই এক দিন তৃপ্ত থাকি, আর এক দিন ক্ষুধার্ত থাকি। ক্ষুধার দিন আমি আপনার সামনে কাকুতি-মিনতি করব এবং আপনাকে স্মরণ করব, আর তৃপ্তির দিন আপনার শোকর আদায় করব ও আপনার প্রশংসা করব। (তিরমিজি, হাদিস নম্বর : ২৩৪৭)
(৬) আবার রোজার কারণে মানুষ যখন ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট অনুভব করে, তখন তার অন্তরে দরিদ্র ও অসহায়দের দুঃখবেদনার অনুভূতি জাগ্রত হয়। যে ব্যক্তি বিলাসিতা ও স্বাচ্ছন্দ্যে লালিত, সে যদি কখনো ক্ষুধা-তৃষ্ণার কষ্ট ভোগ না করে তবে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত মানুষের দুর্দশা সে কীভাবে বুঝবে? কিন্তু রোজার মাধ্যমে যখন সে নিজে এই কষ্টের স্বাদ পায় তখন তার মধ্যে গরিব-দুঃখীদের সাহায্য ও সহযোগিতার অনুভূতি জন্ম নেয় যাতে সে তাদের এই দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্ত করতে পারে। সিরাত গ্রন্থকাররা লিখেছেন রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর জীবনের শেষ দিকে যখন ফাইয়ের সম্পদের কারণে তাঁর আর্থিক কষ্ট দূর হয়েছিল, তখন তিনি আরো বেশি রোজা রাখতে শুরু করেন। যখন এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলো তিনি বললেন: “আমি রোজা রাখি, যাতে গরিবদের ভুলে না যাই।”
(৭) আর এসব কল্যাণের বাইরে রোজা থেকে যে সবচেয়ে বড় অর্জনটি হয়, তা হলো নিজেকে পূর্ণরূপে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করা। এই আত্মসমর্পণ ও আনুগত্য সকল ইবাদতের মূল ও সারকথা। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
سَمِعْنَا وَاَطَعْنَا غُفْرَانَکَ رَبَّنَا وَاِلَیْکَ الْمَصِیْر
আমরা শুনেছি এবং মেনে নিয়েছি। আমরা আপনার ক্ষমা চাই হে আমাদের রব! আর আপনার দিকেই ফিরে যেতে হবে। (সূরা আল-বাকারা, আয়াত : ২৮৫)
আরও বলেন:
اِنَّ صَلاَتِيْ وَنُسُکِيْ وَمَحْیَايَ وَمَمَاتِيْ لِلہِ رَبّ العٰلمین
নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু সবই আল্লাহর জন্য, যিনি সব জগতের প্রতিপালক। (সুরা আল-আনআম, আয়াত : ১৬২)
আর এই আত্মসমর্পণ ও সন্তুষ্টির মানসিকতা রোজার মাধ্যমে এভাবে অর্জিত হয় রোজাদারের সামনে তার পছন্দের বস্তুসমূহ উপস্থিত থাকে, সেগুলো ব্যবহার করার সামর্থ্যও তার আছে এবং সেগুলো ভোগ করার তীব্র আকাঙ্ক্ষাও তার মনে জাগে তবুও সে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সেগুলো স্পর্শ করে না এবং ভোগ থেকে বিরত থাকে। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা রোজাকে বিশেষভাবে নিজের সাথে সম্পর্কযুক্ত করেছেনঃ
کُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدمَ لَہ الاَّ الصِّیَامُ فَاِنَّہ لِیْ وَأنَا اَجْزِی بِہ یَدَعُ طَعَامَہ مِنْ أجَلِيْ وَیدَعُ شَرَابہ مِنْ أجَلِيْ وَیَدَعُ لَذَّتَہ مِنْ اَجَلِیْ وَیَدَعُ زَوْجَتَہ مِنْ اَجَلِیْ
মানুষের প্রত্যেক আমল তার নিজের জন্য কিন্তু রোজা আমার জন্য, আর আমিই এর প্রতিদান দেব। সে আমার জন্য নিজের খাবার ত্যাগ করে, আমার জন্য নিজের পানীয় ত্যাগ করে, আমার জন্য নিজের ভোগবিলাস ত্যাগ করে এবং আমার জন্য নিজের স্ত্রীর সঙ্গও ত্যাগ করে। (বুখারি, হাদিস : ৫৯২৭)
রোজা শরিয়ত হিসেবে নির্ধারণ করার উদ্দেশ্য মানুষকে কষ্ট ও সংকটে নিক্ষেপ করা নয়। যেমনটি আল্লাহ তাআলা নিজেই রোজা ফরজ করার পর ব্যাখ্যা করেছেন,
یُرِیْدُ اللہُ بِکُمُ الْیُسْرَ وَلاَ یُرِیدُ بِکُمُ العُسْرَ
আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজতা চান, তিনি তোমাদের জন্য কঠিনতা চান না। (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৮৫)
বরং রোজার উদ্দেশ্য হলো রুহানিয়তকে শক্তিশালী করা, সংকল্পে দৃঢ়তা আনা, ধৈর্য ও সন্তুষ্টির গুণে অভ্যস্ত করা, দেহকে রোগব্যাধি থেকে রক্ষা করা এবং আল্লাহর নিয়ামতগুলোর প্রকৃত মূল্য মানুষের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠা করা।
রোজা ও আমাদের আচরণ
রমযানুল মুবারকের রোজা যেসব মহৎ উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য ফরজ করা হয়েছিল আমাদের নেককার পূর্বসূরিগণ রোজার আদব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করে সেসব উদ্দেশ্য পূর্ণভাবে অর্জন করেছিলেন। তারা দিনে রোজা রাখতেন এবং রাতে যিকির-ফিকির, নামায ও তিলাওয়াতে মশগুল থাকতেন। রমযানের প্রতিটি মুহূর্ত তারা আল্লাহর ইবাদতে কাটাতেন। তারা তাদের জিহ্বাকে অনর্থক কথা থেকে বিরত রাখতেন, কানকে অশ্লীল ও অসার কথা শোনা থেকে রক্ষা করতেন এবং তাদের দৃষ্টি কখনো হারামের দিকে উঠত না। এভাবে তাদের সমগ্র অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রোজায় থাকত।
কিন্তু আমাদের অবস্থা আজ এমন, এই বরকতময় মাসটিকেও আমরা অন্যান্য মাসের মতো নষ্ট করি। আল্লাহ তাআলা রোজা ফরজ করেছিলেন যাতে আত্মা ও হৃদয় উপকৃত হয় অথচ আমরা রোজাকে উপরপূর্তির মাসে পরিণত করেছি। আল্লাহ একে ধৈর্য ও সহনশীলতা অর্জনের মাধ্যম বানিয়েছিলেন; কিন্তু আমরা একে রাগ, ক্রোধ ও উত্তেজনার মাস বানিয়েছি। আল্লাহ এটিকে প্রশান্তি ও মর্যাদার মাস করেছিলেন; কিন্তু আমরা একে গালাগালি ও ঝগড়াঝাঁটির মাস বানিয়েছি। আল্লাহ রোজা ফরজ করেছিলেন যাতে আমাদের অভ্যাসে পরিবর্তন আসে; কিন্তু আমরা খাবারের সময়সূচি পরিবর্তন করা ছাড়া আর কিছুই পরিবর্তন করিনি।
অনুবাদ- মাওলানা মুবাশ্বির হাসান
সহিহ হাদিস ও আসারের আলোকে ইসরা ও মেরাজ মুফতি আবদুল কাইয়ুম
কুরআন যেন হয় আমাদের হৃদয়ের বসন্ত মুফতি মুহাম্মাদ ফয়জুল্লাহ