বর্ষ: 2025, সংখ্যা: 3
রজব, শাবান, রমজান - ১৪৪৭ | ডিসেম্বর - ২০২৫, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি - ২০২৬
সর্বত্র আমি যেন ফিলিস্তিনের সংকট দেখতে পাই মাওলানা আবুল হাসান আলি নদবি
সর্বত্র আমি যেন ফিলিস্তিনের সংকট দেখতে পাই
মাওলানা আবুল হাসান আলি নদবি
সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার এবং সালাম বর্ষিত হোক তার নির্বাচিত বান্দাদের উপর। প্রফেসর মুহাম্মাদ আব্দুর রহমান খলিফা যেভাবে আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন সেজন্য তাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। এটা আমার জন্য আশ্চর্যের কিছু নয়; এক ভাই অপর ভাইয়ের, এক বন্ধু অপর বন্ধুর ব্যাপারে, যারা মূলত সমবিশ্বাস ও সমচিন্তার, সমসুর ও সমধ্বনির, নিজের মত প্রকাশ করবে, সেখানে জযবা ও অনুভবের মিলন থাকবে, এ তো স্বাভাবিক। বিশেষভাবে এই জন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞ যে, চিন্তাবিদ ও দায়ীদের একটি নির্বাচিত দলের সাথে তিনি পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন এবং মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন। এই দীর্ঘ সফরের এটাই আসল অর্জন ও এটাই তার প্রকৃত মূল্যায়ন। প্রত্নতত্ত্ব ও ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণ করার জন্য এই সফর আমরা করিনি; আমাদের সফরের উদ্দেশ্য ছিল আপন ভাইদের সাথে সাক্ষাৎ করা এবং তাদের সাথে কথা বলা ও মতবিনিময় করা।
বন্ধুগণ!
এই দেশে বসবাসকারী আপন আরব ভাইদের থেকে আমাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল, ইসলামের আলো তারা দূর—দূরান্তে পৌঁছে দেবে। নিঃসন্দেহে প্রথম যুগে তারা এই দায়িত্ব আদায় করেছে। উপমহাদেশের বাসিন্দা আমরা তাদের অনুগ্রহের প্রতি কৃতজ্ঞ। তাদের মাধ্যমে আল্লাহ আমাদেরকে ইসলামের নিআমত দ্বারা সৌভাগ্যবান করেছেন। আপনাদের দেশ সর্বদা ইসলামি দাওয়াতের প্রাণকেন্দ্র ও উৎসক্ষেত্র ছিল। এই দেশের বিজয়ের ইতিহাস, প্রচেষ্টা ও জিহাদের ইতিহাস, ইসলামি বীরত্ব ও সাহসিকতার ইতিহাস আমাদেরকে ইমান ও বিশ্বাস, ইসলামের জন্য গর্ব ও আস্থা, বিভিন্ন সময় হওয়া ইসলামের উপর হামলা এবং ইসলামের শত্রুদের বিভিন্ন যুদ্ধ ও আন্দোলনের মোকাবেলায় শক্তি জুগিয়েছে। অবিচল থাকার প্রেরণা দিয়েছে। বিপদে ও মুসিবতে ধৈর্য ধারণের শিক্ষা দিয়েছে। আমাদের বিপদ—আপদে এই ইতিহাস আমাদের জন্য স্বান্তনার বাণী হয়ে এসেছে। ফুতুহুশ শাম এমন একটি ইতিহাসগ্রন্থ জীবনের সংকটময় মুহূর্তে মুসলমানরা যার শরণ নিতো। এখান থেকে ইমানি সঞ্জীবনী গ্রহণ করত এবং বিপদ—আপদে মোকাবেলা করার শক্তি অর্জন করত। শৈশবের কথা আজও মনে আছে, আমাদের বংশের মেয়েরা একত্রিত হতো এবং তাদের মধ্যে থেকে একজন উর্দুতে ফুতুহুশ শামের কাব্যানুবাদ পড়ে শোনাত। এটি ছিল সেই রণসংগীত যা ফুতুহুশ শাম থেকে নকল করে আমাদের বংশের এক বুজুর্গ (সাইয়েদ আব্দুর রাজ্জাক কালামি) তাতে উর্দু ছন্দের পোশাক পরিয়ে দিয়েছিলেন। গ্রন্থটিতে পংক্তির সংখ্যা ছিল ২৫ হাজার। কোনো না কোনো প্রয়োজনে যখন সেসব মজলিসে আমরা প্রবেশ করতাম, আপনারা ভালো করেই জানেন বাচ্চাদের কত রকম প্রয়োজন থাকে, দেখতাম আমাদের মা—বোনদের চোখ অশ্রুসিক্ত। ঝরঝর করে অশ্রুজল নেমে আসছে দুচোখ বেয়ে। ওইসব সতী—সাধ্বী, পুতপবিত্র নারীদের হৃদয়ে ইমান ও স্বান্তনার মেঘ ছিল ছায়া হয়ে। ওইসব জায়গা তারা বারবার পড়ে শুনতেন যেখানে সাহাবা—তাবিয়িন শরিক হয়েছিলেন, প্রচুর শহীদ ও আহত হয়েছিলেন, কর্তিত মাথা জমিনে লুটিয়ে পড়েছিল এবং রক্তের নদী প্রবাহিত হয়েছিল। মুসলমানদের নিকটাত্মীয় ও প্রিয়তর কেউ দূরে চলে গেলে ওইসব ইসলামি ঘটনা স্মরণ করে তারা নিজেদের মুসিবত ভুলে থাকতেন। তাদের হৃদয়ে ধর্মীয় আবেগ, আল্লাহ তাআলার সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষা এবং বিপদ সহ্য করার দুর্বার শক্তি জন্ম নিত।
পুরুষরাও ওইসব রণসংগীত অত্যন্ত আগ্রহভরে শুনতেন। তাদের শিরা—উপশিরায় ইমান, বীরত্ব ও শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা বিজলির মত ছুটে বেড়াত। তৎকালীন অধিকাংশ অভিজাত মুসলিম ঘরে এই প্রচলন ছিল। এ সকল অভিজ্ঞতার আলোকে এবং এই গৌরবময় উজ্জ্বল দীপ্তিমান ইতিহাসের আলোকে আকাঙ্ক্ষা করেছিলাম যে এই রাষ্ট্রে, যেখান থেকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধর্মের প্রচারকারীগণ বেরিয়ে এসেছিলেন, আমাদের আরব ভাইয়েরা উঠে দাঁড়াবেন এবং এই বৈশ্বিক ও আন্তর্জাতিক পয়গামকে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে দেবেন। ইসলামি বিজয়ের সীমানা প্রসারিত করবেন। বেদনা, আফসোস ও কালের পরিহাস হলো, আজ আপনাদের অনুরোধ করা হচ্ছে যে, ইসলামের পুঁজি এই ভূখণ্ডের হেফাজত করুন। পুরো মুসলিম বিশ্ব এই ইসলামি কেন্দ্রের শাখা ও প্রতিচ্ছায়া। আপনারা হচ্ছেন গ্রন্থের মতন (মূলপাঠ), আমরা হাশিয়া (পার্শ্ববর্তী টীকা)। আপনাদের থেকে আমরা লাভ করি শক্তি, নির্ভরতা, গৌরব ও সম্মান। এখানে যেসব দুর্বলতা দেখা দেয় ইসলামি বিশ্বের প্রতিটি শহরে ও রাজধানীতে প্রত্যক্ষভাবে সেসব আরো বেশি পরিলক্ষিত হয়। কোন অপমান—অপদস্থতায় আপনারা আক্রান্ত হলে দিল্লী, করাচি, জাকার্তা এবং অন্যান্য শহরে মুসলমানদের মাথা হেট হয়ে যায়।
সম্মানিত সুধী!
আপনারা জানেন, ইসলামি বিজয়ের পূর্বে এই অঞ্চল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। খ্রিস্ট ধর্ম ছিল এই অঞ্চলের সরকারি ও সাধারণ ধর্ম। এটা ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের উর্বরতম এলাকা। এখানেই তাদের পবিত্র স্থানসমূহ, ইসা আলাইহিস সালামের জন্মস্থান ও জেরুজালেম অবস্থিত। মানুষের ওপর আল্লাহর রহমতের বান ডাকল; তিনি চাইলেন এখানেই ইসলামের কালিমা বুলন্দ হোক এবং এই অঞ্চল মুসলমানদের কর্তৃত্বে অন্তর্ভুক্তি লাভ করুক। ফলে, আরবরা এই অঞ্চল বিজয় করেন এবং এখানে ইসলাম প্রসার লাভ করে। তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে। পরিণত হয় একটি ইসলামি রাষ্ট্রে। খ্রিস্টান ইউরোপ এই অঞ্চলের প্রতি আগ্রহী হবে এটাই স্বাভাবিক।
আমার মতে, ইউরোপের বড় বড় শক্তিগুলো এই এলাকার প্রতি লোলুপ দৃষ্টিতে তাকানো ইতিহাসের নতুন কোন ঘটনা নয়। এটা তাদের চিন্তার নতুন বাকবদল নয়। তারা তো সর্বকালে এই অঞ্চলের প্রতি লালসার দৃষ্টি দিয়ে রেখেছে। এক মুহূর্তের জন্য এটা মাথা থেকে সরায় নি। এই অঞ্চলকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় এবং এর উপর কর্তৃত্ব অর্জনের খায়েশে তারা বেশ কয়েকবার পাঁয়তারা চালিয়েছে। আপনারা জানেন, ক্রুসেড যুদ্ধগুলো এই আকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষিতে সংঘটিত হয়েছিল। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইউরোপ তার যাবতীয় মাধ্যম ও উপায় ব্যবহার করেছে, করছে। তাদের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। কেননা যেসব বান্দাকে আল্লাহ তাআলা এই রাষ্ট্রের উপর রাজত্ব করা ও রাষ্ট্রের হেফাজতের জন্য নির্বাচিত করেছিলেন তারা সবাই ছিলেন শক্তিশালী, আমানতদার ও বিশ্বস্ত। সব রকম সওদাবাজি, স্বার্থপরতা, কপটতা ও গাদ্দারী থেকে তারা ছিলেন বহু ক্রোশ দূরে। উদাহরণ হিসেবে সালাহুদ্দিন আইয়ুবির উল্লেখ করছি। তিনি ক্রুসেডারদের পরাজিত ও ব্যর্থ করেছেন এবং মুসলমানদের হৃত মর্যাদা ফিরিয়ে এনেছেন। এই দেশের মুসলমান রাষ্ট্রনায়ক ও নেতাগণ আপন দুর্বলতা ও রুচির বিভিন্নতা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের পবিত্রতা ও সম্মানের তোরণ দ্বারে বিশ্বস্ত ও ওয়াফাদার ছিলেন। আমি তো বলি উসমানি তুর্কি বাদশাহরাও এই ইসলামি পবিত্র স্থানসমূহের ব্যাপারে অত্যন্ত আত্মমর্যাদাশীল ছিলেন। পুরো পাঁচ শতাব্দী ধরে তারা এই অঞ্চলের হেফাজত করেছেন। তাদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই; না বংশীয় সম্পর্ক, না জাতীয়তার সম্পর্ক। না ভাষার সম্পর্ক, না সংস্কৃতির। কিন্তু সত্যের সাক্ষ্য প্রদান, ইতিহাসের সাথে ইনসাফ ও বাস্তবতা স্বীকারের জযবা আমাকে এটা বলতে বাধ্য করছে। এভাবে শত্রুদের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বিদ্যমান রয়েছে যে, ইহুদি কনফারেন্সের প্রধান ডক্টর হারডজেল, যাকে জায়নিজমের নবী বলা হয়ে থাকে, সুলতান আব্দুল হামিদ খানের সাথে সাক্ষাৎ করে দরখাস্ত করে, উসমানি সাম্রাজ্যের অধীনে ইহুদিদের জন্য একটি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অনুমতি যাতে দেওয়া হয়। বিনিময়ে সে উসমানি সাম্রাজ্যের সকল ঋণ পরিশোধ (তখন ঋণের পরিমাণ ছিল অনেক) এবং সাম্রাজ্যের জন্য একটি নৌবাহিনী প্রস্তুত করবে যার সকল ব্যায়ভার ইহুদিরা বহন করবে। এছাড়াও উসমানি সাম্রাজ্যকে সুদৃঢ় করার জন্য প্রচুর আর্থিক সাহায্য এবং সুলতানকে ব্যক্তিগতভাবে প্রচুর উপহার-উপঢৌকন প্রদানেরও আশ্বাস দেয়। এত কিছুর পরেও সুলতান আব্দুল হামিদ খান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ইহুদি নেতাকে উত্তর দিয়েছিলেন, "ওসব ধনদৌলত তোমাদের কাছে রেখে দাও; কাজে আসবে। দুনিয়ার সমস্ত ইহুদির ধনদৌলতের সমষ্টি আমার কাছে বাইতুল মুকাদ্দাসের এক মুঠ মাটির সমানও নয়।"
এমনতর বক্তব্যের পরিণতি এই হয়েছিল যে, ইহুদিরা সুলতান আব্দুল হামিদ খানের সিংহাসন উল্টে দেয় এবং জেলখানায় তার ওপর বিভিন্ন রকমের অত্যাচার—নিপীড়ন চালায়। উসমানি সাম্রাজ্য তার সকল দুর্বলতা সত্ত্বেও ইসলামি শক্তির এক বিরাট ও দৃঢ়তর দুর্গ ছিল; শত্রুরা যা দেখে প্রচণ্ড ভয় পেত। সেটা ছিল ওই কাষ্ঠখন্ডের মত, কৃষক যেটা ক্ষেতের জমিনে পুঁতে উপরে কাপড় চড়িয়ে দেয় (কাকতাড়ুয়া বানায়)। পাখিরা দেখে মনে করে কোন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। অথবা দাঁড়িয়ে আছে, ভয়ংকর কোনো চেহারা। ভয়ে তারা ক্ষেতের কাছাকাছি হয় না। কাঠের টুকরোটি যখন জমিনে ভূপাতিত হয় অথবা কোন সেয়ানা কাক বুঝে ফেলে, এটা মানুষ নয়; একটা কাঠের টুকরো মাত্র, অথবা দেখে কাকতাড়ুয়া পড়ে আছে ক্ষেতের উপর, তখন পাখিরা ঝাঁক বেঁধে খেতের উপর হামলে পড়ে এবং ফসল ধ্বংস করে ফেলে। এটাই এ রাষ্ট্রের ইতিবৃত্ত; যার ওপর ছিল উসমানিদের সাম্রাজ্য। শত্রুরা তাকে ভয় পেতো এবং কাছে আসার সাহস করত না। কিন্তু যখন এই দুর্গ ধ্বংস হয়ে গেল বা এই ভয়ংকর কাকতাড়ুয়া ভূপতিত হলো, শত্রুরা দলবেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং সমূলে ধ্বংস করে দিল।
উসমানি সাম্রাজ্যের পতন এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এই রাষ্ট্রে যে সমস্ত নেতাদের মুখোমুখি ইউরোপের হতে হয়েছিল তারা বস্তুবাদ এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার দ্বারা মারাত্মক প্রভাবিত ছিল। আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষাধারার ভয়ংকর প্রভাব তাদেরকে এমনভাবে অন্তসারশূন্য করে দিয়েছিল, যেভাবে উইপোকা বাঁশ খেয়ে ফেলে। ওই সব নেতারা ছিল অবিশ্বস্ত, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী, ধর্মীয় আত্মমর্যাদাবোধহীন, দেশপ্রেম থেকে মুক্ত ও বঞ্চিত। এই অবস্থা দেখে ইউরোপবাসীর রসনা লোভাতুর লালায় ভরে উঠলো। তাদের স্থির বিশ্বাস হয়ে গেল, এতদঞ্চলের নেতাদের অন্তর নিয়ে বেসাতির ও এই অঞ্চলের ওপর আধিপত্য বিস্তারের সময় উপস্থিত। এই অঞ্চল আবহমানকাল থেকেই তাদের প্রিয়ভূমি ছিল। সুতরাং আমাদের নেতারা এমন বস্তুপূজা ও বিবেক বিক্রির প্রমাণ রাখলো যার তুলনা মেলা ভার। দুনিয়ার নশ্বরতা এবং জীবনের অস্থিতিশীলতার দরজায় তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিল। আল্লাহ তাআলার ইরশাদ :
وَمَا هَذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَهْوٌ وَلَعِبٌ وَإِنَّ الدَّارَ الْآخِرَةَ لَهِيَ الْحَيَوَانُ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ
অর্থ : এই পার্থিব জীবন তো ক্রীড়াকৌতুক ব্যতীত কিছু নয়; পারলৌকিক জীবনি তো প্রকৃত জীবন, যদি তারা জানতো। [সুরা আনকাবুত আয়াত ৬৪]
اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرٌ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرٌ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ كَمَثَلِ غَيْثٍ أَعْجَبَ الْكُفَّارَ نَبَاتُهُ ثُمَّ يَهِيجُ فَتَرَاهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَكُونُ حُطَامًا وَفِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ شَدِيدٌ
অর্থ : তোমরা জেনে রেখো পার্থিব জীবন তো ক্রীড়াকৌতুক, জাঁকজমক, ও ধনেজনে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ব্যতীত আর কিছু নয়। এর উপমা হলো বৃষ্টি, যা দ্বারা উৎপন্ন শস্য ভান্ডার অবিশ্বাসীদেরকে চমৎকৃত করে। পরিশেষে তা খড়কুটোয় পরিণত হয়। আর পরকালে রয়েছে কঠিন শাস্তি। [সূরা হাদীদ আয়াত ২০]
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এরশাদ :
اللهم لا عيش الا عيش الآخرة
অর্থ : হে আল্লাহ পরকালের জীবন ব্যতীত অন্য কোন জীবন নেই।
আল্লাহ তাআলার উপর থেকে মানুষের বিশ্বাস উঠে গিয়েছিল এবং দুনিয়াবী ইজ্জত সম্মান পথ—পদবি অর্জনের জন্য এমনভাবে প্রচেষ্টা শুরু করেছিল যেন এটাই জীবনের মূল লক্ষ্য। ক্ষমতা লাভের জন্য নীতি, আদর্শ, ইজ্জত, সুনাম, চরিত্র, ঐতিহ্য সব অকাতরে বিলিয়ে দিতে শুরু করেছিল।
প্রিয় বন্ধুগন!
যুদ্ধের ময়দানে যাওয়ার আগে প্রথম যুদ্ধক্ষেত্র মানুষের হৃদয়ে সংঘটিত হয়। মানুষ যখন তার অন্তরের আভ্যন্তরীণ যুদ্ধে বিজয় লাভ করে তখন বহিরাগত যুদ্ধেও সফলতা ও বিজয় অর্জন নিশ্চিত হয়ে যায়। অন্তরের যুদ্ধ অগ্রগণ্য ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আত্মিক যুদ্ধে আমরা হেরে গেছি। আমাদের হৃদয় ও বিবেক বিকিকিনির মালে পরিণত হয়েছে। এজন্যই শত্রুদের নাপাক উদ্দেশ্য ও সাম্রাজ্য বিস্তারের সংকল্পের পথে কোন প্রতিবন্ধক নেই। সকল আর্বাচীনের জন্য পথ সুগম হয়ে গেছে। এই দেশগুলোর ওপর শত্রুরা কর্তৃত্ব লাভ করার পর এখন তারা যেভাবে চায় ক্রয়-বিক্রয় করে। নিজেদের সমস্ত সংকল্প ও পরিকল্পনাকে পূর্ণতার পরিচ্ছেদে সাজায়। রাষ্ট্র তাদের সামনে অসহায় ও অপারগ হয়ে থাকে। তড়পাতে থাকে। দুশমনের হাত ধরে ফেলতে পারে না। কারণ জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা ও রাষ্ট্রের সাথে গাদ্দারি থেকে কেবল দুটি জিনিস আটকাতে পারে :
এক. শক্তিশালী আকিদা—বিশ্বাস। নিঃসন্দেহে আকিদা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং দৃঢ়তর জিনিস।
দুই. সত্যিকারের দেশপ্রেম। যা পশ্চিমা এবং কিছু প্রাচ্যীয় জাতির মুষ্টিমেয় নেতাকে এই লজ্জাজনক অপরাধ থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে। কিন্তু আমাদের নেতাদের জন্য কোন জযবা প্রতিবন্ধক হতে পারে? যাদের কাছে না আকিদা আছে না সত্যিকারের দেশপ্রেম। এ কারণেই অধিকাংশ সময় আমরা শুনি, অমুক পার্টির লিডার আরব ইসলামি রাষ্ট্রের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও যুদ্ধরত এলাকা দুশমনদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। অথবা অমুক নেতা দুশমনের ক্রীড়নক ও এজেন্ট। অনেক সময় এমন দেখা যায় যে, দুশমনদের চেয়েও তার বেশী আগ্রহ নিজের স্বার্থের প্রতি। যেন মামলায় বাদীর চেয়ে সাক্ষীর আগ্রহ বেশি।
প্রিয় সুধীবৃন্দ!
আপনারা ইসলামের কঠিনতর ফ্রন্টে এবং মুসলমানদের সর্বশেষ কেল্লায় অবস্থান করছেন। বন্যার ঢল শহরের সুরক্ষা প্রাচীর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। প্রাচীর অতিক্রম করতে পারলেই আর কোন বাধা তাকে আটকাতে পারবেনা। সর্বশেষ সুরক্ষা রেখা নির্ধারিত। যদি এই লাইন দুশমন অতিক্রম করে ফেলে তাহলে সমগ্র ইসলামি বিশ্ব তাদের পদানত হবে। সমস্ত মুসলমানদের দৃষ্টি আপনাদের উপর লেপ্টে আছে। আপনারাই তাদের সম্মান ও মর্যাদার উৎস। আপনারাই তাদের ইজ্জত ও শক্তির মানদণ্ড। আমি বলছি না, আপনারা শুধু ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় সম্মান রক্ষার্থে আল্লাহকে ভয় করুন; আমি বলছি আল্লাহকে আপনারা ভয় করুন সমগ্র মুসলিম জাতির সুনাম—সুখ্যাতি রক্ষার্থে ও ইসলামের উন্নতি ও অগ্রগতি সাধনের উদ্দেশ্যে। ওই সকল মুসলিম জাতির দিকে তাকিয়ে আল্লাহকে ভয় করুন যারা আপনাদেরকে ইসলামের সর্বপ্রথম ঝান্ডাবাহীদের জীবন্ত নমুনা বলে মনে করে। ওইসব মাসুম আত্মার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করুন যারা এখনো মানবশরীরে আত্মপ্রকাশ করেনি। তাদের পবিত্র ভূমি এবং মর্যাদাপূর্ণ জিনিসগুলো যদি আপনারা হেফাজত করেন এবং তাদের জন্য রেখে যান গৌরবময় অতীত তবে তারা আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করবে এবং আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ হবে। আপনাদের কীর্তিগাথা নিয়ে গর্ব করবে। নতুবা আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করে তারা বলবে, আপনারা তাদের পবিত্র ভূমিসমূহ হাতছাড়া করে ফেলেছেন। তাদের অতীতকে কলঙ্কিত করেছেন। তাদের জন্য অপমান—অপদস্থতা ছাড়া কিছুই রেখে যান নি। এই সমাবেশ ও এই মূল্যবান সুযোগ আমার হৃদয়ে বেদনার এক তুফান সৃষ্টি করেছে। হৃদয়ের ক্ষতগুলোকে জাগিয়ে তুলেছে। আমি ইসলাম ও মুসলমানদের সংকটকে একটি সমস্যা মনে করি। পুরো ইসলামি বিশ্বকে আমি একটি রাষ্ট্র মনে করি। আমি মনে করি মুসলমানদের সামনে সংঘটিত প্রতিটি ঘটনা এবং পুরো ইসলামি দুনিয়ার এক ইঞ্চি জমিনের উপরও দুষমনদের কব্জা অত্যন্ত মর্মান্তিক বিষয়। সর্বত্র আমি যেন ফিলিস্তিনের সংকট দেখতে পাই। যেখানেই যাই ভেজা চোখ নিয়ে আরব কবি মুতামমিম বিন নাবিরার কবিতাগুলো আবৃত্তি করি :
لقد لامني عند القبور على البكا * رفيقي لتذراف الدموع السوافك
وقال ابتكى كل قبر رأيته * لقبر ثوى بين اللوى والدكادك
فقلت له أن الشجا يبعث الشجا * فدعني فهذا كله قبر مالك
কবর গুলোর পাশে অশ্রু বন্যা বইয়ে দেয়ার উপর আমার সফরসাথী আমাকে তিরস্কার করল
সে বলল, লুই ও দাকাদিকের মধ্যবর্তী স্থানে থাকা এই কবরটির কারণে তুমি যে কবরই দেখো অশ্রুপাত করতে থাকো
আমি বললাম, এক ব্যথা অন্য ব্যথাকে জাগিয়ে তোলে। আমার কাছে এই সব কবরই মালিকের কবর।
অনুবাদ : মুফতি নুরুযযামান নাহিদ
ইসলামের দৃষ্টিতে নির্বাচন ও নেতৃত্ব মুফতি নুরুযযামান নাহিদ
এআই-এর ফাতওয়া ও শরিয়াহ বিশ্লেষণ : সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা মুফতি মাসুম বিল্লাহ