বর্ষ: 2025, সংখ্যা: 3
রজব, শাবান, রমজান - ১৪৪৭ | ডিসেম্বর - ২০২৫, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি - ২০২৬
এআই-এর ফাতওয়া ও শরিয়াহ বিশ্লেষণ : সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা মুফতি মাসুম বিল্লাহ
এআই-এর ফাতওয়া ও শরিয়াহ বিশ্লেষণ : সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা
মুফতি মাসুম বিল্লাহ
1. ভূমিকা (Introduction)
بسم الله والحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله وعلى آله وأصحابه وأتباعه إلى يوم لقاء الله , وبعد :
نسأل الله سبحانه التوفيق والصواب والسداد , ونعوذ به من الخطأ والضلال والزلل والخلل , آمين يا رب العالمين !
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক। দরুদ ও সালাম নাযিল হোক সেই মহাসত্তার ওপর, যিনি হিদায়াত নিয়ে আগমন করেছিলেন; তাঁর পবিত্র পরিবার, সম্মানিত সাহাবীগণ এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর পথ অনুসরণকারীদের প্রতি।
মানবজাতির প্রতি আল্লাহর রহমতের অন্যতম প্রকাশ হলো—তিনি মানুষের জন্য যে শরিয়াহ নাযিল করেছেন, তা প্রতিটি যুগ ও সমাজের জন্য পথপ্রদর্শক এবং উপযোগী। শরিয়াহর সার্বজনীনতা ও কালোত্তীর্ণ বৈশিষ্ট্য নিশ্চিত করার জন্য যুগে যুগে এমন আলিমের প্রয়োজন হয়েছে, যারা মানুষের বাস্তব সমস্যার উপর ভিত্তি করে শরিয়াহর নির্দেশনা ব্যাখ্যা করতে পারেন এবং ফাতওয়া প্রদান করতে পারেন। এই শরিয়াহ মানুষের যাবতীয় দুনিয়াবি ও দীনি লেনদেনের হুকুম-আহকাম ব্যাখ্যা করার জন্য আলিম—জ্ঞানীদের অস্তিত্ব অপরিহার্য করে দিয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তোমরা জানো না, তাহলে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস কর।” (আন-নাহল ১৬:৪৩)
সমসাময়িক যুগে প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি এমনসব যন্ত্র তৈরি করেছে, যেগুলো চিকিৎসক, অর্থনীতিবিদ কিংবা আইন বিশেষজ্ঞদের মতো কাজ করতে পারে। এমনকি ইসলামি প্রশ্নোত্তরের ক্ষেত্রেও এআই-ভিত্তিক সফটওয়্যার তৈরি হয়েছে, যা ফাতওয়া প্রদানের বৈধতা ও সীমানা নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
এই গবেষণার উদ্দেশ্য হলো প্রশ্নটির উত্তর দেওয়া:
এআই কি মুফতি বা ফাতওয়া প্রদানের যোগ্য?
এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে, ইসলামি ফাতওয়া প্রক্রিয়া কী এবং মুফতি হওয়ার জন্য ক্লাসিক্যাল যোগ্যতাগুলো কীভাবে এআই-এর সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
অগ্রগতি, পরিবর্তন এবং বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক উন্নতির ফলে মানবসভ্যতা আজ এমন এক পর্যায়ে উপনীত হয়েছে, যার নাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence—AI)।
এআই-এর সর্বোত্তম সংজ্ঞা দিয়েছেন ফিলিপ জনসেন, তিনি বলেন:
"The science and engineering of machines with capabilities considered intelligent by human intelligence standards."
“মানুষের বুদ্ধিমত্তার মানদণ্ডে যাকে বুদ্ধিমান বলা যায়, এমন ক্ষমতাসম্পন্ন যন্ত্র তৈরির বিজ্ঞান ও প্রকৌশল।” [Mark Coeckelbergh, AI Ethics, trans. Hiba Abdulaziz Ghannam, p. 51.]
বক্ষ্যমাণ গবেষণা প্রবন্ধে AI-এর সক্ষমতা, সীমাবদ্ধতা এবং ইসলামি ফাতওয়া ব্যবস্থায় প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রস্তাব করা হয়েছে কিভাবে AI-কে সর্বোচ্চ “সহায়ক” হিসেবে ব্যবহার করে মানব মুফতীর নেতৃত্বে নিরাপদ ও শারিয়াহ-সম্মত ইফতা-ফাতওয়া ব্যবস্থা চালানো যায়।
1.1 প্রেক্ষাপট
মানুষ এমন এক যুগে পৌঁছেছে যেখানে যন্ত্র তাদের প্রায় সব কাজেই সহায়তা করছে—ধর্ম ও ইবাদত সম্পর্কিত বিষয়েও। এমনকি আজ AI ব্যবহার করে ফতোয়া প্রদান, ধর্মীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া—এমন উদাহরণও দেখা যাচ্ছে।
AI বিপ্লব শিক্ষা, চিকিৎসা, ক্রীড়া, ব্যবসা— মানুষের জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রবেশ করছে। ইসলামি ফতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রেও এর প্রয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজ আমরা দেখি, এআই ব্যবহার করে ইসলামি আইনি হুকুম (ফাতওয়া) প্রদানের চেষ্টা চলছে।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence, AI) মানুষের জ্ঞান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। বিশেষত লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (Large Language Models, LLM) যেমন ChatGPT, Gemini ইত্যাদি দ্রুত তথ্য-সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, ভাষাগত পুনর্নির্মাণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ধর্মীয় জ্ঞানব্যবস্থায় AI-এর ব্যবহার এক নতুন চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। কিছু প্ল্যাটফর্ম ধর্মীয় তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও উপস্থাপনে এমনকি “AI Mufti” বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা ফাতওয়া প্রদান করার ধারণা প্রচার করছে। ব্যবহারকারীরা AI-এর কাছে ইসলামি প্রশ্ন, হালাল–হারাম সংক্রান্ত জিজ্ঞাসা, বিবাহ, তালাক, নৈতিক ইস্যু ইত্যাদির সমাধান চাইছে।
যদিও এটি প্রাথমিকভাবে সুবিধাজনক মনে হতে পারে, কিন্তু মানব মুফতীর আত্মিক-নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্বের সঙ্গে তুলনা করলে AI-এর সীমাবদ্ধতা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফাতওয়া কেবল ইনফরমেশন বা তথ্য-সংগ্রহের বিষয় নয়; এটি কুরআন-সুন্নাহর টেক্সট, উসুল-মূলনীতি, উসুলুল ফিকহ, কাওয়ায়িদুল ফিকহ, ফুরুউল ফিকহ, আহকামে শরিয়াহ, মাকাসিদে শরিয়াহ, মেযাজে শরিয়াহ, ইজতিহাদ, ইসতিম্বাত, উরফ নির্ভরতা, বিচারিক আইন-নীতি, প্রেক্ষাপট বোঝা, মুস্তাফতী-প্রশ্নকারীর পরিস্থিতি বিবেচনা এবং তাকওয়া ও নৈতিক সতর্কতার উপর নির্ভর করে। AI এই দিকগুলো ধারণ করতে অক্ষম। এছাড়াও, LLM-এর ট্রেনিং ডেটাসেটে লিবারেল বায়াস, পুরানো বা অসম্পূর্ণ আরবি-ফারসি-উর্দু উৎস, এবং statistical hallucination-এর ঝুঁকি রয়েছে। ফলে AI-নির্ভর ফাতওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
1.2 গবেষণার আলোকে সমস্যা বিবরণী (Problem Statement)
যদিও AI তথ্য প্রক্রিয়ায় দক্ষ; তবে নিম্নলিখিত সীমাবদ্ধতার কারণে একজন মানব মুফতীর স্থান নিতে অক্ষম:
1. প্রেক্ষাপটের অভাব: AI কেবল টেক্সট বিশ্লেষণ করে; মুস্তাফতী-প্রশ্নকারীর বাস্তব অবস্থা, আবেগ, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি অনুভব ও হৃদয়ঙ্গম করতে সে অক্ষম। ফলে, সে কেবল ততটুকু উত্তর দিতে সক্ষম যতটুকু তাকে বলা হয়; বাস্তবতা বিচার করতে ও পরিস্থিতির স্পর্শকাতরতা অনুধাবন করতে অপারগ।
2. নৈতিক ও আত্মিক বোঝাপড়ার অভাব: ফাতওয়া দেওয়ার জন্য তাকওয়া, নৈতিক সতর্কতা, আল্লাহভীতি এবং আধ্যাত্মিক বিবেচনার প্রয়োজন। কিন্তু AI তা থেকে সম্পূর্ণ শূন্য।
3. ভুল তথ্যের ঝুঁকি: LLM hallucination বা statistical errors–এর কারণে ভুল হাদীস, ভুল বা অসম্পূর্ণ ফাতওয়া, ভুল ও বানোয়াট রেফারেন্স প্রদান অহরহ করছে।
4. ডেটাসেট বায়াস: লিবারেল ও পশ্চিমা দর্শন-নির্ভর ট্রেনিং ডেটা ইসলামি উসুল এবং কাওয়ায়েদের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
5. ভাষাগত সীমাবদ্ধতা: পুরোনো আরবি, ফারসি ও উর্দু কিতাব পড়তে AI এখনও সক্ষম নয়।
1.3 গবেষণার উদ্দেশ্য (Research Objectives)
• কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করা।
• ইসলামি জ্ঞানব্যবস্থায় AI-এর সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করা।
• ফাতওয়া দেওয়া ও শরীয়াহ আদালত পরিচালনায় AI-কে নিরাপদভাবে অন্তর্ভুক্ত করার কৌশল প্রস্তাব করা।
• মুসলিম বিশ্বের জন্য Islamic AI Governance Framework নির্মাণের প্রাথমিক ধারণা উপস্থাপন করা।
1.4 গবেষণার গুরুত্ব (Significance of the Study)
• শিক্ষা ও মাদ্রাসা ব্যবস্থায় প্রভাব: ছাত্র এবং নবীন মুফতীরা AI ব্যবহার করতে শুরু করেছে।
• ফাতওয়া ও শরিয়াহ আদালত: AI-নির্ভর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ভুল রায় এবং সামাজিক বিভ্রাটের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
• ইসলামি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক: AI-নির্ভর ফাতওয়া মানবিক, নৈতিকতা ও তাকওয়া-ভিত্তিক দায়িত্বের বিকল্প হতে পারে না।
1.5 গবেষণার সীমাবদ্ধতা (Scope of the Study)
• শুধুমাত্র AI-সাপোর্টেড ফাতওয়া এবং ইসলামি জ্ঞানব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা।
• অন্যান্য পেশা (চিকিৎসা, আইন, প্রশাসন) শুধু তুলনামূলক উদাহরণ হিসেবে।
• প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ সীমিত; AI-এর প্রোগ্রামিং বা কোডিং বিশদ নয়।
2. গবেষণার বিশ্লেষণ
2.1 কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ধর্মীয় জ্ঞান
AI সম্প্রতি মানুষের জ্ঞানব্যবস্থায় বিপুল পরিবর্তন এনেছে। বিশেষত LLM তথ্য-সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ ক্ষেত্রে মানুষের মতো দ্রুত উত্তর দিতে সক্ষম। AI ধর্মীয় বিষয়ের উপর কাজ করতে পারে, তবে এর নির্ভুলতা এবং তাকওয়া ও আধ্যাত্মিক দিকের সীমাবদ্ধতা সুস্পষ্ট।
সুবিধা:
• দ্রুত তথ্য প্রক্রিয়াকরণ
• তুলনামূলক বিশ্লেষণ (বিভিন্ন মতামত, historic fatwa)
সীমাবদ্ধতা:
• নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক বোঝাপড়া অনুপস্থিত
• ট্রেনিং ডেটাতে লিবারেল বা পশ্চিমা দর্শন
• ক্লাসিক্যাল আরবি, ফারসি ও উর্দু কিতাবের সীমাবদ্ধতা
• অথেনটিক হাদীস ও ফিকহ এবং রেফারেন্স এর নির্ভুল উপস্থাপন ও প্রয়োগ
2.2 AI এর ফাতওয়া ধারণা এবং বাস্তবতা
• কিছু প্ল্যাটফর্ম “AI Fatwa” বা “AI Mufti” ধারণা প্রচার করছে।
• সমস্যা: Hallucination, bias, precedent neglect।
• Stanford AI Ethics Report (2024) ও অন্যান্য রিপোর্ট অনুযায়ী, AI-এর চূড়ান্ত ফাতওয়া প্রদান বিপজ্জনক।
2.3 ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা ও AI
• শিক্ষার্থীরা comparative fiqh ও fatwa compilation–এ AI ব্যবহার করছে।
• “এআই গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু মানব মুফতির নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিবেচনাকে কখনোই প্রতিস্থাপন করতে পারে না।”
2.4 AI এবং ফাতওয়া প্রক্রিয়া
২. ফাতওয়া প্রদানের স্বরূপ ও কাঠামো
ইসলামি ফাতওয়া কোনো যান্ত্রিক রায় প্রদানের নাম নয়; বরং এটি চারটি মৌলিক উপাদানের উপর দাঁড়িয়ে আছে—
১. মুফতি (যিনি রায় দেন)
২. মুসতাফতি (যিনি প্রশ্ন করেন)
৩. প্রকৃত ঘটনা/ঘটনা-বিবরণ
৪. রায় (হুকুম)
অসংখ্য ক্ষেত্রে প্রথম তিনটি উপাদান উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও মুফতি রায় দিতে বিরত থাকেন, কারণ তিনি আরও অনুসন্ধান-তদন্ত চান, অথবা প্রশ্নকারীর অবস্থা বিবেচনা করে উত্তর দেন না। এই সূক্ষ্ম মানবিক বিবেচনা যান্ত্রিকভাবে পুনর্নির্মাণ করা অসম্ভব।
৩. ফাতওয়া চর্চায় এআই ব্যবহারের ধরণ
৩.১ মুফতির সহায়ক হিসেবে এআই
এআই ব্যবহার করা যেতে পারে—
• ফাতওয়ার খসড়া তৈরিতে
• পুরনো ফিকহি মতামত খুঁজে বের করতে
• মিলযুক্ত কেস শনাক্ত করতে
• ভাষাগত বা টেক্সট অনুসন্ধানে
ডিজিটাল লাইব্রেরি বা সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহারের মতোই এটি একটি উপকারী প্রয়োগ হতে পারে।
৩.২ মুফতির বিকল্প হিসেবে এআই
এ পদ্ধতিতে মানুষের সম্পৃক্ততা বাদ দিয়ে এআই-কে স্বয়ংসম্পূর্ণ মুফতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানেই কেন্দ্রীয় বিতর্ক।
এটি বৈধ বা অবৈধ নির্ধারণ করতে হলে মুফতির ক্লাসিক্যাল যোগ্যতাগুলো এআই পূরণ করে কিনা—তা যাচাই করতে হবে।
৪. এআই-এর ফাতওয়া প্রদানে অযোগ্যতার মৌলিক বাধাসমূহ
৪.১ মৌলিক/উসুলি বাধা
ফিকহি ঐকমত্য হলো—মুফতি হতে হলে একজনকে হতে হবে—
• মুসলিম এবং শরীয়ত-সাপেক্ষ (মুকাল্লাফ)
• বিশ্বস্ত (ثقة)
• চরিত্রবান (عدل)
• সুস্থ বিচারশক্তিসম্পন্ন
• সঠিকভাবে কিয়াস ও ইস্তিনবাত করতে সক্ষম
এআই মুসলিম নয়, জীবও নয়—অতএব প্রথম শর্তেই ব্যর্থ।
৪.২ ফিকহি/ইজতিহাদি বাধা
ফাতওয়ার জন্য প্রয়োজন—
• সমাজের রীতি-নীতি (عرف)
• মানুষের মানসিকতা
• সংস্কৃতি
• বিভিন্ন শ্রেণির বাস্তব পরিস্থিতি
অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় রীতি-নীতি দুটি বৈধ মতের মধ্যে কোনটি গ্রহণযোগ্য হবে তা নির্ধারণ করে।
কোনো ডেটাসেট—যতই বড় হোক—মানুষের জীবিত অভিজ্ঞতা, অনুভূতি এবং প্রেক্ষাপট-সমঝদারি তৈরি করতে পারে না।
৪.৩ আধ্যাত্মিক (সুলুকি) বাধা
মুফতির কাজে নির্ভর করতে হয়—
• আল্লাহভীতি (তাকওয়া)
• নৈতিক শুদ্ধতা
• ইলমের নূর
• আল্লাহর তাওফিকের উপর
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তোমরা আল্লাহকে ভয় কর; আল্লাহ তোমাদের শিক্ষা দেবেন।” (বাকারা ২:২৮২)
“যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তাকে ফুরকান দান করেন।” (আনফাল ৮:২৯)
এআই কখনো তাকওয়া, ইলহাম বা ফুরকান অর্জন করতে পারে না।
৫. ব্যবহারিক বিবেচনা
• দাওয়াত ও নসিহত: মুফতির কথার মধুরতা, সহানুভূতি ও নসিহত মানুষের জীবন বদলে দেয়—এআই তা দিতে পারে না।
• সংবেদনশীল রায়ে ভুলের ঝুঁকি: বিশেষত তালাক ও লেনদেন সম্পর্কিত উত্তরে এআই এর ভয়াবহ ভুল প্রমাণিত হয়েছে—যা অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
৬. ফলাফল ও বিশ্লেষণ (Findings & Discussion)
৬.১ মূল ফলাফল
• AI তথ্য অনুসন্ধান ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ (comparative analysis)–এ সহায়ক
• মানব মুফতী নৈতিক, আধ্যাত্মিক এবং জটিল সিদ্ধান্ত ও বিচার–এ ক্ষমতাবান কিন্তু AI অক্ষম
• AI-কে শুধুমাত্র সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে
৬.২ ফাতওয়া প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় প্রভাব
• প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা: কিছু রিসার্চ স্কিল উন্নয়ন হতে পারে, কিন্তু দূরদর্শী বিজ্ঞচিত নির্ভুল সিদ্ধান্ত ও বিচার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
• ইফতা ও আদালত: ব্যবস্থাপনা ও দ্রুততা বৃদ্ধি, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত AI-র ওপর নির্ভর ঝুঁকিপূর্ণ
• নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক: AI-নির্ভর ফাতওয়া অপর্যাপ্ত
৬.৩ নীতি ও সুপারিশ
• শরিয়াহ শাসন কাঠামো / শরিয়াহ গভর্ন্যান্স কাঠামো (Shariah Governance Framework)
• মানব-মুফতির তত্ত্বাবধান (Human-Mufti oversight)
• শিক্ষাগত নির্দেশিকা (Educational guidelines)
• প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি (Technological preparedness)
• নৈতিক নিরীক্ষা (Ethical audit)
৭. উপসংহার ও সুপারিশ (Conclusion & Recommendations)
৭.১ উপসংহার
এআই নিঃসন্দেহে গবেষণা প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে, তথ্য সংগঠনে সহায়তা করে এবং ফিকহি উপকরণে দ্রুত প্রবেশাধিকার দেয়। কিন্তু—
• মৌলিক উসূলী শর্ত
• ফিকহি-ইজতিহাদী যোগ্যতা
• আধ্যাত্মিক শুদ্ধতা ও আল্লাহভীতির প্রয়োজনীয়তা
—এসবের কোনোটিই এআই পূরণ করতে পারে না।
এআই-তে নৈতিক জবাবদিহিতা, মানবীয় প্রজ্ঞা, বাস্তবতার গভীর উপলব্ধি, তাকওয়ার আলো নেই—যা ইসলামি আইনি সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি।
AI (LLM) ইসলামি জ্ঞানব্যবস্থা ও ফাতওয়া প্রক্রিয়ায় কার্যকর সহায়ক হতে পারে। তবে প্রাসঙ্গিক/প্রেক্ষিতভিত্তিক অনুধাবন (contextual understanding), নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সিদ্ধান্ত ও বিচার (ethical & spiritual judgment)–এর অভাব এবং hallucination/ bias-এর কারণে এটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত–এর জন্য ব্যবহার করা অনুমোদিত নয়।
অতএব, এআই একজন শক্তিশালী সহায়ক হতে পারে; কিন্তু কখনোই মুফতি হতে পারে না।
৭.২ মূল শিক্ষা
1. AI সহায়ক, প্রতিস্থাপক নয়
2. Bias & Hallucination সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি
3. প্রশিক্ষণে AI অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তবে গভীর ও বিজ্ঞচিত চিন্তা-নিরীক্ষা অপরিহার্য
4. মানব ও AI যৌথ মডেল কার্যকর
5. শরীয়াহ শাসন বা গভর্ন্যান্স অপরিহার্য
৭.৩ চূড়ান্ত মন্তব্য
AI মানব-মুফতীর বিকল্প নয়। সঠিক শরিয়াহ শাসন/গভর্ন্যান্স, মানব চিন্তা-গবেষণায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অত্যধিক সতর্কতা গ্রহণ করলে এটি নিরাপদ ও কার্যকরী সহায়ক হিসেবে ব্যবহারযোগ্য। এতে মানব মুফতীর যোগ্যতা-দক্ষতা বজায় থাকে, গতি বৃদ্ধি পায়, এবং নীতিগত সামঞ্জস্য ও আস্থা-বিশ্বাস বজায় থাকে।
আল্লহ তাআলা আমাদেরকে সকল প্রকার বিচ্যুতি থেকে হেফাজত করুন এবং সীরাতে মুসতাকীমে অচিলতা দান করুন আমীন।
— রচনায় —
মুফতী মাসুম বিল্লাহ
সিনিয়র মুফতি ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম (মসজিদুল আকবর), মিরপুর ১, ঢাকা।
উস্তাযুল ইফতা, মারকাযুল বুহূস আল-ইসলামিয়া ঢাকা, মিরপুর ১, ঢাকা।
প্রধান মুফতি, মুনাওয়ারা ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, মানিকগঞ্জ।
মুফাসসিরে কুরআন, বিসিআইসি হাউজিং জামে মসজিদ, মিরপুর ১, ঢাকা।
চেয়ারম্যান, শারীয়াহ এ্যাডভাইজরি এন্ড রিসার্চ কাউন্সিল (এসএআরসি)
মেম্বার, শরিয়াহ এ্যাডভাইজরি কাউন্সিল, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)
মেম্বার, শরিয়াহ বোর্ড, বাংলাদেশ ইসলামিক মেডিকেল সোসাইটি (বিমস)
ইসলামের দৃষ্টিতে নির্বাচন ও নেতৃত্ব মুফতি নুরুযযামান নাহিদ
সর্বত্র আমি যেন ফিলিস্তিনের সংকট দেখতে পাই মাওলানা আবুল হাসান আলি নদবি